সোমবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
সিলেটে সুরমায় বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ৩ জন নিহত  » «   সিলেট থেকেই নির্বাচনের প্রচার শুরু করবেন হাসিনা  » «   টার্নিং পয়েন্ট খালেদার মামলা  » «   এবার সৌদি-ইসরাইল রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত  » «   ভারতীয় স্কুলগুলোতে কোরআন শিক্ষার তাগিদ দিলেন মানেকা গান্ধী  » «   প্রত্যাশিত দেশ গড়তে চাই কাঙ্খিত নেতৃত্ব : শিবির সেক্রেটারি  » «   ঢাবি সিনেটে বিএনপিপন্থীদের ভরাডুবির কারন ফাঁস !  » «   সিলেটের আবাসিক হোটেল থেকে তরুণ-তরুণীর লাশ উদ্ধার  » «   ফ্রান্সে প্রথম বাংলাদেশি কাউন্সিলর শারমিন  » «   কবে, কে হচ্ছেন ২২তম প্রধান বিচারপতি?  » «   যে ছবি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বিতর্কের ঝড়  » «   শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ‘নিখোঁজ’ দুই কর্মকর্তাসহ তিনজন গ্রেফতার  » «   এবার হজে যেতে পারবেন ১ লাখ ২৭ হাজার বাংলাদেশি  » «   এমপিপুত্রের শেষ স্ট্যাটাস ‘তোর জন্য চিঠির দিন..’  » «   নেতানিয়াহুর গ্রেফতার দাবিতে ইসরাইলে লাখো জনতার বিক্ষোভ  » «  

মুসলিম উম্মাহর মানসিক বিপর্যয় ঃ কারণ ও প্রতিকার – ১

 images

ড. আব্দুল্লাহ আল-খাতির:   সকল প্রশংসা সর্ব শক্তিমান মহান আল্লাহ তা’আলার। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবাীগণের উপর। “আল হাযীমাতুন্নাফসিয়্যাহ ইনদাল মুসলিমীন” বা মুসলিম উম্মাহর মানসিক বিপর্যয় বইখানি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, আল-মুনতাদা আল ইসলামীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ড. আব্দুল্লাহ খাতির (রহ.) এর দ্বিতীয় পুস্তক। মুলতঃ এটি একটি ভাষন, যা তিনি বৃটেনে প্রদান করেছিলেন।
অতীতে বহু যুগ ধরে লক্ষ্য করা গেছে যে, মুসলিম জাতি চিন্তা-চেতনায়, শক্তি-সামর্থে ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমান সময়ে এ বিপর্যয় আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই এ বিষয়টির আলোচনা খুবই গুরুত্বের দাবীদার।

আজকের মুসলিম জাতি প্রকাশ্যেই তাদের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, তারা মুনাফিকীর জীবন বেছে নিয়েছে। তারা সত্যিকার মুসলিমদের সাথেও নয়, আবার পুরাপুরি ইসলামের শত্র“দের সাথেও নয়, বরং এর মাঝামাঝি একটা পথ ইখতিয়ার করেছে, যার চিন্তা- চেতনা, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য একেবারে অস্পষ্ট। তারা আজ দ্বীন ইসলামকে পূর্ণ অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেও কোন অগ্রগতি বা সফলতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। পরিণতিতে শুধু পিছিয়ে পড়েছে। এটাই হল প্রকৃত বিপর্যয়। যে ব্যক্তি নিজের আদর্শকে আঁকড়ে ধরেছে, হোক তা সামাজিক আবহাওয়ার প্রতিকূল, তার আদর্শের পতাকা শত প্রতিবন্ধকতায়ও সমুন্নত রেখেছে। সেই পারে নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কুরবানী করতে, ত্যাগ স্বীকার করতে।

আর যে ব্যক্তি নিজের আদর্শে অটল নয়, সামাজিক আবহাওয়ায় যার আদর্শ বারবার বদলে যায় সে কিছুই করতে পারেনা। পারে শুধু নিজের সাথে প্রতারণা করতে। এটাও মানসিক বিপর্যয়। মহান রাব্বুল আলামীন যেন এদের সম্পর্কেই বলেছেন ঃ

এমন কিছু মানুষ আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করেছি, অথচ তারা বিশ্বাস স্থাপন করেনি। তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদের ধোকা দিতে চায়। তারা শুধু নিজেদেরই প্রতারিত করে। কিন্তু তারা তা অনুধাবন করে না। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি। আল্লাহ তাদের ব্যাধি বৃদ্ধি করে দেন। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। কারণ তারা মিথ্যাচারে লিপ্ত। (সুরা- আলবাকারা : ৮-১০)

যারা এ রকম দোটানায় ভোগে তারা কোন ভাল পন্থা বেছে নিতে সক্ষম হয় না। তাই তারা একটা বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তহীনতার জীবন যাপন করে। কারণ তাদের কাছে থাকে না সত্যের মাপকাঠি, যার মাধ্যমে সবকিছুকে সুসংগঠিত করতে পারে। আর এটাই হচ্ছে জীবন পরিচালনায় উত্তম পন্থা নির্ধারণে প্রথম সিদ্ধান্ত। অতএব মুনাফিক, আরামপ্রিয় ও প্রতারকরা এমনভাবে কাজ করে যাতে তাদের সঠিক পরিচয় ফুটে না উঠে এবং যাতে তারা ঝামেলামুক্ত জীবন যাপন করতে পারে, যদিও তাতে ক্ষতিপূরণ ও যথেষ্ট মূল্য দিতে হোক না কেন। তাদের মান সম্মান ও মানবাধিকার ছিনিয়ে নেয়া হোক না কেন, তারপরও তারা ভোগ বিলাসিতায় ব্যস্ত থাকতে চায়। অতএব কোথায় তাদের জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত ও উত্তম পন্থা? ফলে তারা কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হতে পারে না। পারে না দৃঢ় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে কিংবা প্রস্তুতি নিতে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন ঃ

 “আর যদি তারা বের হবার সংকল্প নিত তাহলে অবশ্যই কিছু সরঞ্জাম প্রস্তুত করত। কিন্তু তাদের উত্থান আল্লাহর পছন্দ নয়। তাই তাদের নিবৃত্ত রাখলেন এবং বলা হল, বসা থাকা লোকদের সাথে তোমরা বসে থাক। (সূরা তাওবা : ৪৬)

তাদের আর একটি খাছলত হল, তারা ইসলামের নামে নিজেদের নামকরণ করতে চায়। তাদের পরিচয় বহন করে নিজেদের মুসলিম হিসাবে জাহির করে। আর এগুলো করে নিজেদের স্বার্থের জন্য। একই সময় তারা মনের পাশবিক চাহিদা মিটায় এবং জুলুম-অত্যাচার ও দুর্নীতিগ্রস্ত জীবন পদ্ধতি অবলম্বন করে। ফলে তারা কোন সংকট সংঘর্ষের মুখোমুখী হবার সাহস ও সামর্থ হারিয়ে ফেলে। তখন তারা সঠিক পথ গ্রহণ করবে নাকি ভ্রান্ত পথ, এ নিয়ে মতদ্বৈততায় ভোগে। এটাও একটি মানসিক বিপর্যয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন ঃ

 “যখন তারা মু’মিনদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি, আর যখন তারা নিভৃতে তাদের দলপতি ও দুষ্ট নেতাদের সাথে মিলিত হয় তখন বলে, আমরা তোমাদের সাথেই আছি, আমরা তো শুধু ঠাট্টা বিদ্রুপ ও প্রহসন করে থাকি।” (সূরা বাকারা : ২:১৪ আয়াত)

আসলে এ ধরণের লোকেরা সবচেয়ে বেশী মানসিক বিপর্যয়ে ভোগে। আর এরাই যে কোন বিপদ-সংকটের মুখোমুখী হতে ভয় পায়। তারা আরও ভয় পায় সেগুলো অবলোকন করতে, স্বীকার করতে, ভূমিকা নিতে এবং সুসংগঠিত করতে। এটি হচ্ছে আর একটি মানসিক বিপর্যয়। আল্লাহ তাআলা বলেন ঃ

“আর যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর তাহলে তারা বলবে, আমরা তো শুধু আলাপ-আলোচনা ও হাসি তামাশা করছিলাম। তুমি বলে দাও ঃ তাহলে কি তোমরা আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি হাসি তামাশা করছ? (সূরা তাওবা : ৬৫)

লোকদের মাঝে সবচেয়ে বেশী মানসিক বিপর্যস্ত ঐ ব্যক্তি যে কোন উদ্দেশ্য ছাড়া কাজ করে, কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পিত লক্ষ্য ছাড়া চেষ্টা করে। তবে ঐ ব্যাপক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে কোন শিক্ষনীয় নেই যা পরিশ্রমী ও অপরিশ্রমী এবং মুজাহিদ ও অমুজাহিদরা সমানভাবে করে থাকে। বরং ঐসব লক্ষ্য ও উদ্দেশের মাধ্যমে শিক্ষনীয় রয়েছে যা এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অতএব যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে এবং যারা বসে থাকে তাদের সকলের যদিও উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর ইবাদত করা, কিন্তু মুজাহিদগণ তাদের জিহাদের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, দীন সম্পূর্ভভাবে আল্লাহর, যাতে কোন ফিতনা থাকবে না। ঐ ব্যক্তির চেয়ে অধিক বিপর্যয় আর হতে পারে না যে ব্যক্তি কাজ করে ও জিহাদ করে- কিন্তু তা এজন্য নয় যে, দীন সম্পূর্ণই আল্লাহর জন্য হোক, বরং দীনকে ধ্বংস করার জন্য এবং ফিতনা সৃষ্টির জন্য। আর এটাই সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নস্যাৎ করে দেয়, যার কারণে সে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনা এবং উৎকৃষ্ট পন্থা নির্ণয় করতে সক্ষম নয়। এবং সে সংকটের মুখোমুখি হতে অক্ষম। অতএব এমন ব্যক্তির চেয়ে কঠিন মানসিক বিপর্যয়পূর্ণ আর কাউকে পাবেনা।
আজকের এ সময়ে এ ধরণের মানসিক বিপর্যয়ের শিকার মুসলিম উম্মাহ। আর এ সকল বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার দিক নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন ড. আব্দুল্লাহ খাতির।

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাকে তার এ মহান প্রচেষ্টার পুরস্কার দান করুন। আমাদের সকলকে এর দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান কারুন। তিনিই তো সর্বশ্রোতা ও প্রার্থনা কবুলকারী। সালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের প্রতি নাযিল হোক।

ড. আব্দুর রায্যাক মাহমূদ ইয়াসীন আল হামদ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল বিভাগ
বাদশহ সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়,
রিয়া, সৌদী আরব।
তাং-১২-১০-১৪১১ হিজরী।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ

অদ্যকার এ মহতী সম্মেলনে হাজির হয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দ উপলব্ধি করছি। কারণ এ সম্মেলন উপলক্ষে আমি সাক্ষাত পেয়েছি তারুণ্যদীপ্ত এমন এক যুব সম্প্রদায়ের, যারা ধর্মীয় চেতনায় উজ্জীবিত। যাদের আকাংখা সীমাহীন, উৎসাহ ক্লান্তিহীন এবং অফুরন্ত যাদের প্রাণ-চাঞ্চল্য।

অতএব আমি বলব, আজকের এ সম্মেলন ঐ সকল তরুণদের জন্য, যারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা’আলা কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের আমলের পরিবর্তন করে। এ সম্মেলন সে সব তরুণদের জন্য, যারা সব সময় ইসলামের ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী, হতাশাবাদীদের হতাশা যাদের কখনো নিরাশ করে না।

আজকের এ সম্মেলন এমন এক যুব সম্প্রদায়ের জন্য, যারা একটি পরিবর্তন ও সফল বিপ্লবের প্রত্যাশা করে। যদিও এ ক্ষেত্রে তারা এমন এক প্রবীন সম্প্রদায়ের বাধার সম্মুখীন হয়, যারা নিজেদের অলসতা, পশ্চাৎপদতা, পরাজয় বরণকে কৌশল তথা বিচক্ষনতা, দূরদর্শীতা ও বুদ্ধিমত্তার কাজ বলে বৈধতা দানের প্রয়াস চালায়। তারা নিজেরা তো পরাজয় বরণ করেই নিয়েছে, এখন অন্যদের ললাটেও পরাজয়ের কালিমা লেপনের চেষ্টায় লিপ্ত।
আজকের সম্মেলন তাদের জন্য, যারা জানে যে, হাজার মাইলের পথ-পরিক্রমণও প্রথমতঃ এক পা দিয়েই শুরু হয়।
অদ্যকার এ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় রাখা হয়েছে “মুসলিম উম্মাহর মানসিক বিপর্যয় ও তার প্রতিকার”। আমার মতে বাক্যটিকে এত ব্যাপকভাবে না বলে এভাবে বলা উচিত “অধিকাংশ মুসলিমের মানসিক বিপর্যয়…। সকল মুসলিমের উপর মানসিক বিপর্যয়ের দোষ চাপিয়ে দেয়াকে আমি সমীচীন মনে করি না। কারণ, হাদীসের ভাষ্য মতে উম্মাতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি বিশেষ জামাআত সর্বদা হক্বের উপর অটল থাকবে। বিপক্ষ শক্তি তাদের কোন প্রকার ক্ষতি করতে পারবে না। এতে বুঝা যায়, এ দলটি কখনো মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হবে না।
আমি এখানে আপনাদেরকে হতাশ করে দিতে উপাস্থিত হইনি যে, শুধুমাত্র দুর্দশাগ্রস্ত মুসলিমদের দুরবস্থা নিয়ে আলোচনা করেই ক্ষান্ত হব, বরং একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ও মুসলিমদের বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থার একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে মানসিক ব্যাধিগুলো চিহ্ণিত করে তার প্রতিবিধান সম্পর্কে কিছু আলোচনা করব। আর এজন্যই আমি এখানে উপস্থি হয়েছি।

এই যে একটি ব্যাধি-যে ব্যাধিতে আজ অধিকাংশ মুসলিম আক্রান্ত এর যেমন কিছু লক্ষণ ও কারণ রয়েছে তেমনি রয়েছে তার প্রতিকার ব্যবস্থা। আমি আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাকে পাশ্চাত্যের পদ্ধতি বর্জন করে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ ব্যাধির লক্ষণ ও কারণ চিহ্ণিত করতঃ তার সুষ্ঠু চিকিৎসার সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়ার তাওফীক দান করেন। আমীন!!প্রথম পরিচ্ছেদ

মানসিক বিপর্যয়ের লক্ষণসমূহ

প্রথম লক্ষণ ঃ মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা

আজ অনেক মুসলিমই এতে আক্রান্ত। এদের যে কারো সাথে মুসলিমদের বর্তমান দুরবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করলে বুঝা যায়, তারা মুসলিমদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন, ভাবছেন এ দুরবস্থা হতে মুসলিমদের মুক্তির কোন উপায় নেই। অধিকন্তু তারা এর সাথে সামঞ্জস্যশীল দু’ একটি বাগধারা বা উদাহরণ পেশ করে তা প্রমাণের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। যেমন তারা বলেন, মুসলিমদের এ অবস্থার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা নিছক ‘অরণ্যে রোদন’ ছাড়া কিছুই নয়। কেউ আবার বলেন, এ প্রচেষ্টা ফুটো বেলুনে ফুঁক দেয়ার মতই। ফুটো বেলুনে ফুঁক দিয়ে যেমন কোন ফায়দা নেই, তেমনি মুসলিমদের বিরাজমান অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করেও কোন লাভ নেই। কতিপয় মুসলিমের এ ধরনের উক্তি উদ্যমীদেরকে হতাশ করে দেয়। যারা একটি বিপ্লবের প্রত্যাশা করে, যারা অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে চায়, তাদেরকে নৈরাশ্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করে।
উপরোক্ত মনোভাব যাদের মাঝেই রয়েছে, বুঝতে হবে তারা নিশ্চিতভাবে মানসিক বিপর্যয়ের শিকার। এদের অনেকের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী এবং বড় আলেমও রয়েছেন। আপনি তাদের কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, ধর্মজ্ঞানহীন বা ধর্ম-বিমুখ মুসলিমদের দ্বীনি শিক্ষার কোন ব্যবস্থা করছেন না কেন? উত্তরে তিনি এ বলে দায়িত্ব এড়াতে চেষ্টা করবেন যে, কে আছে তোমার পাশে? কে তোমার নছিহত গ্রহণ করবে? কেউতো তোমার কথা শুনতে আগ্রহী নয়। বস্তুতঃ এ ধরনের ব্যক্তি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং পতনের দ্বার প্রান্তে উপনীত। তাই তারা এধরনের উক্তি করে থাকে।
মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হীনমানসিকতার একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে বলেছেন ঃ

যখন কোন ব্যক্তি বলে যে, মানুষ সব ধ্বংস হয়ে গেছে, তাহলে বুঝতে হবে মূলতঃ সেই তাদেরকে ধ্বংসে নিপতিত করল। অন্য বর্ণনা মতে, সে’ই মুলতঃ ধ্বংসে নিপতিত (মুসলিম : ২/৩২৯)

প্রথম বর্ণনায় أهلكهم  বা “সেই তাদেরকে ধ্বংসে নিপতিত করল”- এর ব্যাখ্যা হলো, “সবাই ধ্বংস হয়ে গেছে” বলার দ্বারাই যেন সে তাদেরকে ধ্বংসে নিপতিত করল। কারণ সবাই তো আর এমনটি নয়। আত্মপ্রত্যয়ী, সত্যনিষ্ঠ ও সৎ সাহসী লোক পৃথিবীতে সর্বদাই বিদ্যমান থাকে। কিন্তু হতাশাগ্রস্তদের এ ধরণের উক্তি আশাবাদীদের উৎসাহ, উদ্দীপনায় ভাটার সৃষ্টি করে।

আর দ্বিতীয় বর্ণনা মতে أهلكهم  বা “সে’ই ধ্বংসে নিপতিত” এর ব্যাখ্যা হলো, কোন ব্যক্তি যখন মনে করবে যে, মানুষ সব ধ্বংস হয়ে গেছে, সবাই ভ্রষ্ট হয়ে গেছে, এখন তাদের পরিশুদ্ধির কোন পথ নেই, এদের উদ্ধারে মেহনত করা ও শ্রম দেয়া একেবারেই বৃথা, তাহলে বুঝতে হবে সে নিজেই ভ্রান্তিতে নিপতিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।
বর্ণিত হাদীসটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা এ ধরনের বিপর্যস্ত ও হতাশাগ্রস্ত মানসিকতার স্বরূপ উন্মোচিত করে দিয়েছে। এই হীনমানসিকতা আজ বহু মুসলিমকে গ্রাস করে নিয়েছে। ‘লোকে শুনবে না’ এ দোহাই দিয়ে দিয়ে তারা অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং আল্লাহর পথে দাওয়াতের কাজ থেকে গা বাঁচিয়ে চলে। ফলে তারা হীনমন্যতায় ভোগে এবং সর্বদা হতাশায় নিমজ্জিত থাকে। পরিণতিতে তারা দ্বীনের প্রচার-প্রসার এবং আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার বা সত্য প্রতিষ্ঠা ও অন্যায় প্রতিরোধের মহা দায়িত্ব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে।

দ্বিতীয় লক্ষণ ঃ বিপর্যন্ত অবস্থার উপর আত্মসন্তোষ

আপনি এক শ্রেণীর লোকদের দেখবেন, যারা জ্ঞানে গুনে ও সৎকর্ম সম্পাদনে নিজেদের চেয়ে নিম্ন স্তরের লোকদের প্রতি বেশী লক্ষ্য করে। অথচ এসব বিষয়ে সব সময় নিজেদের চেয়ে অগ্রগামীদের প্রতিই লক্ষ্য করা উচিত। কিন্তু তারা তা না করে নিজেদের অবস্থার উপর পরিতুষ্ট থেকে আত্মপ্রসাদ লাভ করে থাকে। দ্বীনের ক্ষেত্রে সীমাহীন দূরাবস্থায় থাকা সত্ত্বেও নিজেদের সাফাই গেয়ে এই বলে নির্দোষ হতে চায়, আরে! আমরাতো অনেকের চেয়ে ভালই আছি। এগিয়ে আছি।

তৃতীয় লক্ষণ ঃ সৃজনশীল মানসিকতা বর্জন ও পরনির্ভরশীল জীবন যাপন

মুসলিমদের একটি বিরাট অংশ আবিস্কার, উদ্ভাবনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। তারাও যে আবিস্কারক ও উদ্ভাবক হতে পারে এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে, তা যেন তারা কল্পনাও করে না। ফলে তাদেরকে সর্বদা অন্যের করুণা নির্ভর হয়েই থাকতে হয়। বহু মুসলিম দেশ আজ এ রোগে আক্রান্ত। তারা তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সাধারণ জিনিসটি পর্যন্ত নিজেরা তৈরী করতে পারে না। সবকিছুই তারা অন্যদেশ থেকে আমদানী করে থাকে। ফলে এসব দেশকে সব সময় অন্যদের মুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হয়। বস্তুত ঃ এটাও এক ধরণের মানসিক দূর্বলতা এবং নিজেদের শক্তির বিপুল ভান্ডার সম্পর্কে অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

চতুর্থ লক্ষণ ঃ বিজাতীয় সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া

এই লক্ষণটি এক শ্রেণীর মুসলিমদের মাঝে পরিলক্ষিত হয়, যারা পাশ্চাত্য বা প্রাচ্যের বিভিন্ন অমুসলিম দেশে লেখা-পড়া করতে যায় এবং সে সব দেশের শিক্ষা- সংস্কৃতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে। বিজাতীয় সভ্যতায় প্রভাবিত হওয়াটাই ঐ লোকগুলোর বিপর্যন্ত মানসিকতার প্রমাণ বহন করে। কারণ, তারা ভাল মন্দের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারেনি। বিজাতিদের জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং তাদের তথাকথিত সভ্যতার মাঝে পার্থক্য নিরূপণে তারা অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ফলে পাশ্চাত্যের ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব কিছুই তারা গ্রহণ করে স্বদেশে আমদানী করে।
বস্তুত ঃ পাশ্চাত্য জগত যান্ত্রিক দিক দিয়ে উৎকর্ষ সাধন করলেও নৈতিকতা ও মানবিকতার ক্ষেত্রে তারা একেবারেই পিছিয়ে। তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির যে চিত্র আমরা অবলোকন করছি, তা নিতান্তই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর।
কিন্তু যদি তাদের মানবিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং তাদের কৃষ্টি-কালচার, রীতি-নীতি ও সার্বিক জীবন প্রণালীর প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, এক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে।
এক কথায় বিজাতিদের উন্নতি ও অগ্রগতি কেবল যান্ত্রিক সভ্যতার, মানবিক সভ্যতার নয়। পক্ষান্তরে আমাদের রয়েছে একটি পরিপূর্ণ দ্বীন, যার আদলে জীবন গড়ার মাধ্যমে আমরা মানবিক ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করতে পারি। এ ব্যাপারে আমরা কারো মুখাপেক্ষী নই। হ্যাঁ, প্রয়োজনে যান্ত্রিক বিষয়ের জ্ঞান তাদের কাছ থেকে নিয়ে তা আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ব্যবহার করতে পারি।

পঞ্চম লক্ষণ ঃ নতজানুমূলক নীতি গ্রহণ

রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে আজ মুসলিমদের আত্মসমর্পনমূলক মনোভাব লক্ষ্য করা যায় যা মানসিক বিপর্যয়ের একটি বিশেষ লক্ষণ। ফলে দেখা যায় যে, কোন চুক্তি বা সন্ধির ক্ষেত্রে মুসলিম নেতৃবৃন্দ নতজানুমূলক চুক্তি অথবা প্রাপ্যের অর্ধাংশ বা কিয়দাংশের উপরও চুক্তি করতে লজ্জাবোধ করে না। যেমন মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনেকেই বলে থাকে যে, ‘ইসরাইল রাষ্ট্র এখন বাস্তব সত্য। তাদের সাথে এখন আমাদের মিলে মিশেই থাকা উচিত।’
বস্তুত ঃ তারা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার কারণে শত্র“র উপর প্রাধান্য বিস্তারের সৎ সাহস হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে তারা এ ধরণের মনোবৃত্তি পোষণ করে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন ঃ

 “তোমরা হীবনল হয়োনা, চিন্তা করোনা। তোমরাই জয়ী হবে যদি তোমরা মু’মিন হও।” (আলে ইমরান : ১৩৯)

প্রকৃত মু’মিন হয়ে জয়ী হওয়ার ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য তারা আজ হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণেই ফিলিস্তিন প্রেক্ষাপটে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও তারা সন্তুষ্ট চিত্তে তা বরণ করে নিয়েছে। অথচ তাদের কর্তব্য ছিল ফিলিস্তিনকে ইহুদীদের কবল থেকে মুক্ত করার নিমিত্তে পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আবার আক্রমণ করা এবং তাদের যাবতীয় ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পুনঃ পুনঃ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
আরও দুঃখজনক বিষয় হল, কতিপয় ওলামায়ে কেরামের বিভিন্ন বক্তব্য ও বিবৃতিতে উক্ত বিষয়ের প্রতি নীরব সমর্থন লক্ষ্য করা যায়। তারা এই দুরবস্থার পরিবর্তনের দিক-নির্দেশনা দেয়ার পরিবর্তে সাফাইমূলক বক্তব্য প্রদান করে থাকেন। এটাও বিপর্যস্ত ও দুর্বল মানসিকতার পরিচায়ক।

ষষ্ট লক্ষণ ঃ ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশে সংকোচবোধ

এই লক্ষণটি মুসলিম যুব সমাজের মাঝে বেশী দেখা যায়। তাদের মধ্যে এই প্রবণতা এতই বেশী যে, তারা হালালকে হালাল, আর হারামকে হারাম বলতেও সংকোচবোধ করে। বিশেষ করে যখন তারা কোন অমুসলিমের মুখোমুখি হয়,আর তাকে কোন হারাম জিনিস অফার করা হয়, কিংবা কোন হারাম কাজের প্রতি আহ্বান করা হয় তখন তা ‘নো, থ্যাংকস’ অথবা এ জাতীয় কিছু বলেই ক্ষান্ত হয়। তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে এ কথা বলতে নারাজ যে, ‘আমি মুসলিম, আমার ধর্মে এটা হারাম ও গর্হিত কাজ।’
আবার অনেকে এমনও রয়েছে, যারা তাদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করতে ভয় পায় এই আশংকায় যে, তাকে ‘গোড়া’ ‘সাম্প্রদায়িক’ ‘চরমপন্থী’ ‘মৌলবাদী’ (Fundamentalist) প্রভৃতি বলে কটাক্ষ করা হবে। এ পর্যুদস্ত মানসিকতা আরও স্পষ্ট রূপে ধরা পড়ে কতিপয় মুসলিমের পোশাক-পরিচ্ছদে। তারা যখন কোন অমুসলিম রাষ্ট্র সফর করে তখন তারা ইসলামের পরিচয়বহী পোশাক পরিত্যাগ করে বিজাতীয় বেশ-ভূষা অবলম্বন করে। এমন কি তারা খৃষ্টানদের জাতীয়তার প্রতীক ‘টাই’ ব্যবহার করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এরা বিজাতিদের সব কিছু অবলীলায় গ্রহণ করতে যেন আনন্দ বোধ করে। পশ্চিমাদের মন জয় করতে এরা সর্বক্ষেত্রে তাদের রীতি-নীতি গ্রহণ করে “নব্য ইউরোপিয়ান” সাজতে চায়। ইসলাম অনুমোদিত পোশাক-পরিচ্ছদ ও তাহযীব-তামদ্দুনের প্রতি এদের কোন আকর্ষণ নেই। এ জন্য এরা নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি মোতাবেক জীবন যাপন করাকে অপমানকর মনে করে। এটা তাদের দুর্বল মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
পক্ষান্তরে যারা উত্তরাধিকার সূত্রে মুসলিম নয়, বরং অন্য ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছে, নতুন ও তার হুকুম আহকাম, শরয়ী অনুশাসন পালনে তাদের নিষ্ঠা এবং ইসলামী কৃষ্টি-কালচারের প্রতি আকর্ষণ রীতিমত বিস্ময়কর।
একজন ইংরেজ নব-মুসলিমের ঘটনাই শুনুন, যিনি ইসলামী পরিচয় প্রকাশে মোটেও কুন্ঠিত হননি, বরং ইসলামী পরিচয় প্রকাশ করাকে তিনি গর্বের বিষয় মনে করেছিলেন।
তিনি ইসলাম গ্রহণের তিন সপ্তাহ পর অন্য এক শহরে চাকুরীর সন্ধান পেয়ে সেখানে যাওয়ার জন্য মনস্থ করলেন। এদিকে স্থানীয় একটি ইসলামী যুব কল্যাণ সংস্থার লোকজন তার সাথে সাক্ষাৎ করে পরামর্শ দিতে চেয়েছিল যে, তিনি যেন ইন্টারভিউ কালে ইসলাম গ্রহণের কথা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকাশ না করেন, যাতে বিষয়টি চাকুরীতে অমনোনীত হওয়ার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ তারা আশংকা করছিল যে, ইসলাম গ্রহণের কারণে চাকুরীতে অমনোনীত হলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে নতুন ধর্ম ত্যাগ করতে পারেন। কিন্তু তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেনি। ততক্ষণে তিনি ইন্টারভিউ দিতে চলে গেছেন।
সেখানে তিনি আরো অনেক অমুসলিম লোকের দেখা পেলেন, যারা একই পদে চাকুরী প্রার্থী। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন তার ইন্টারভিউ শুরু হল, তিনি কর্মকর্তাদের বলে দিলেন ঃ আমি স্বধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম হয়েছি, পূর্বে আমার নাম ছিল ‘রোড’ আর বর্তমান নাম হল ‘উমার’। তিনি আরো বললেন, “আমি যেহেতু ইসলাম গ্রহণ করেছি সেহতেু আমাকে এই পদের জন্য মনোনীত করা হলে অবশ্যই নামাযের সময় দিতে হবে।”
উক্ত নব-মুসলিম যুবকের ইসলামী পরিচয় প্রকাশ চাকুরীর পথে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতো করেইনি, বরং তা চুকুরীর জন্য সহায়ক হয়েছে। কারণ, কর্মকর্তারা তাকে তৎক্ষণাৎ উক্ত পদের জন্য মনোনীত করেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, কর্মকর্তারা এই যুবকের ধর্মান্তরিত হওয়ার সংবাদে কোন প্রকার বিরূপ প্রতিক্রিয়া তো দেখায়নি, উপরন্তু তার এ সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলল, “আমরা এই পদের জন্য এমনই একজন ব্যক্তির সন্ধান করছিলাম, যিনি সকল প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন। আর আপনার মাঝে আমাদের প্রত্যাশিত গুণটি পাওয়া গেল। কারণ আপনি চরম বৈরী পরিবেশে থেকেও স্বধর্ম ত্যাগ ও নাম পরিবর্তনের মত একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে ব্যতিক্রমধর্মী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছেন, আপনাকে ধন্যবাদ।”
এই নব-মুসলিম তার ইসলামী পরিচয় প্রকাশ করেছে স্বগর্বে। কারণ তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন সামাজিক সেই সব সংকীর্ণতা বর্জন করে, যা আমাদের মাঝে বিদ্যমান। আমরা সে সব আল্লাহদ্রোহী ও হীনমন্য মুসলিমদের জন্য হিসাব কষি, যারা নিজেদের জীবনে ইসলামী বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করতে চায় না। আমরা তাদের সাথে মাঝামাঝি ধরনের একটি সমঝোতায়ও আসতে চেষ্টা করি যেন তারা বুঝতে না পারে যে, দ্বীনের ব্যাপারে আমরা আপোষহীন এবং নামায রোযার প্রতি যত্নশীল।
বস্তুতঃ মানসিক পরাজয়টা এখান থেকেই সৃষ্টি হয়, যা মানুষের পরিচয় ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে স্বগর্বে প্রকাশ করতে বাধা দেয়। যারা নতুন করে মুসলিম হয়, তারা পারিপার্শ্বিক কোন চাপ ছাড়াই দ্বীনের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছুকেই মনে প্রাণে গ্রহণ করে নেয় এবং তা মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরতে সচেষ্ট হয়। ফলে তারা যে কোন প্রতিকুল পরিবেশে নিঃসংকোচে স্বীকার করেঃ “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, আর এটা আমার ইসলামী পোশাক, সুতরাং তা পরিধান করতে আপত্তি কিসের?”
আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন যে, তারা যে কোন স্থানে ইসলামী পোশাক পরিধান করে থাকেন এবং এসব পোশাক পরিধান করতে গর্ববোধ করেন। ধর্মীয় বিধানের প্রতি তাদের এই আগ্রহবোধ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, তারা পুরোপুরি দ্বীন মেনে চলতে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণ দ্বীন বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। দৃষ্টান্ত স্বরূপ এখানে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) গণের অসংখ্য বিস্ময়কর কাহিনী থেকে একটি কাহিনী বর্ণনা করব, যা আমাদের অন্তঃচক্ষু খুলে দিবে।
ঘটনাটি ঘটেছিল পারস্যের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ চলাকালে। এ যুদ্ধে পারস্যের সেনাপতি ছিল রুস্তম, আর মুসলিমদের সেনাপতি ছিলেন সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)। মুসলিম বাহিনী যখন পারস্য সীমান্তের নিকটবর্তী হলো, তখন রুস্তম দূত মারফত মুসলিমদের আগমনের কারণ জানতে চাইল। জবাবে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করলেন। এ দলের প্রধান ছিলেন রিবয়ী ইবনে আমের (রা.) প্রতিনিধি দল রুস্তমের সভাকক্ষে পৌছলে রুস্তম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের আগমনের উদ্দেশ্য কি?
রিবযী ইবনে আমের (রা.) বললেন, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে বের করে আল্লাহর গোলামীর পথ দেখাতে, এবং দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে তাঁর প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে। এ কথা শুনে রুস্তমের মনোজগতে এক আলোড়ন সৃষ্টি হল। সে মনে মনে ভাবতে লাগলো, কি দুর্ভাগ্য আমার! এই বিশাল সেনাবাহিনী যাতে কেবল গায়িকা আর বাবুর্চিই রয়েছে হাজার হাজার, অথচ এই লোকের (রিবযী ইবনে আমেরের) মত দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন একজন লোকও নেই।
রিবয়ী (রা.) এসেছেন একটি অখ্যাত দ্বীপ থেকে যাদেরকে বলা হয় মরুবাসী বেদুঈন। রুস্তমের সম্পদের জৌলুস ও নাগরিক সভ্যতার তুলনায় যাদের কোন সভ্যতাই নেই। এতদসত্ত্বেও রিবয়ী (রা.) রুস্তমকে বলেছেন, ‘পার্থিব জীবনের সংকীর্ণতা থেকে প্রশস্ততা’র দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা। রিবয়ী (রা.) কথাগুলো রুস্তমের কাছে দুর্বোধ্যই মনে হলো। এজন্য তার ললাটে ফুটে উঠল চিন্তার রেখা।
রিবয়ী ইবনে আমের (রা.) আরও বললেন, আমরা এসেছি ধর্ম নামের অধর্মগুলোর বর্বরতা হতে মানব জাতিকে মুক্ত করে ইনসাফপূর্ণ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিতে। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে তাঁর দ্বীন সহকারে বান্দাদের কাছে প্রেরণ করেছেন যে আমরা তাদেরকে দ্বীনের পথে আহ্বান করি। যারা এই দ্বীন গ্রহণ করবে, আমরা তাদেরকে সাদরে বরণ করে নেব এবং কোনরূপ সংঘর্ষ ছাড়াই দেশে ফিরে যাব। আর যারা এই দাওয়াত প্রত্যাখান করবে, আমরা তাদের সাথে অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহর প্রতিশ্র“তি অর্জন করে ধন্য হব।
রুস্তম বলল ঃ তোমাদের আল্লাহর প্রতিশ্র“তি কি?
রিবয়ী (রা.) বললেন ঃ যারা যুদ্ধে মৃত্যুর সূধা পান করবে, তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত সুখের চিরন্তন আবাস জান্নাত। আর যারা বেঁচে থাকবে, তাদের রয়েছে অনিবার্য সফলতা ও গৌরবময় বিজয়।
রুস্তম বলল ঃ ঠিক আছে, তোমাদের বক্তব্য শুনলাম। এ ব্যাপারে কিছুদিন সময় চাই, যাতে আমরা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারি। রিবয়ী (রা.) বললেন ঃ বেশ তো! আপনাদের ক’দিন সময় দরকার, একদিন না দু’দিন?
রুস্তম বলল ঃ দু-একদিন নয়, বরং আমাদের নেতৃবৃন্দ ও নীতি-নির্ধারকদের সাথে আলোচনা করা পর্যন্ত সময় দরকার।
রিবয়ী (রা.) বললেন ঃ দুশমনের মুখোমুখি অবস্থানকালে প্রতিপক্ষকে তিন দিনের অধিক সময় দেয়া আমাদের নবীজীর নীতি নয়। তিনি কথাগুলো বললেন জোরালো ভাষায় দীপ্ত কন্ঠে।
রুস্তম এতে বিস্মিত হয়ে বলল ঃ আপনি কি তাদের নেতা?
রিবয়ী (রা.) বললেন ঃ না, আমি তাদের নেতা নই। কিন্তু সমগ্র মুসলিম জাতি অভিন্ন দেহের ন্যায়। তাদের সাধারণ ব্যক্তিও বিশেষ লোকদের অনুমোদন ছাড়াই যে কোন লোককে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এতে সবাই তা মেনে নিতে বাধ্য থাকে।
রুস্তম কথাবার্তায় আরও নমনীয় হয়ে গেল এবং সভাসদবৃন্দের পরামর্শ চাইল। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, সে যেন পরাজয় বরণ করে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু তার সভাসদবর্গ তাকে প্ররোচনা দিয়ে বলল, আপনি কি এ ‘কুকুর’ দের কাছে আপন ধর্ম ও মান-মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে দিবেন? ওদের পোশাকের দিকে চেয়ে দেখুন, ওরা কত নিকৃষ্ট!
রুস্তম বলল ঃ ধ্বংস হোক তোমাদের! পোষাকের দিকে দেখোনা, বরং তাদের চিন্তা-চেতনা, কথা-বার্তা ও স্বভাব-চরিত্রের দিকে তাকাও। আরবরা খাদ্য-বস্ত্রকে তুচ্ছ মনে করে, কিন্তু তারা তাদের বংশীয় মর্যাদা রক্ষা করে।
সাহাবী রিবয়ী ইবনে আমের (রা.) এর বক্তব্য শুনে এই ছিল রুস্তমের প্রতিক্রিয়া। অথচ বর্তমানে আরবরা সম্পূর্ণ এর বিপরীত। তারা এখন পোশাকের প্রতিই গুরুত্ব দেয় বেশী। আর বংশের ব্যাপারে এতই শিথিলতা প্রদর্শন করে যে, অমুসলিম নারীদের সাথে সম্পর্ক করতেও তারা কুন্ঠাবোধ করে না। এ রকম আরও অনেক নিন্দনীয় কাজে তারা জড়িত। তারা বিভিন্ন রকমের ফ্যাশন ও বিনোদনের পিছনেই সময় কাটায় বেশী। সব সময় নতুন নতুন মডেলের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। এদের পোশাক  এখন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। শীত, গ্রীষ্ম, বসন্ত তথা ঋতু ভিত্তিক জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক  পরিধান করা এদের নিত্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এটাই বর্তমান আরবদের প্রকৃত রূপ।
রিবয়ী বিন আমের (রা.) এর ঘটনা বলার উদ্দেশ্য হল, দ্বীনের তাবলীগের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের অসীম সাহসিকতা ও বুলন্দ হিম্মতের দৃষ্টান্ত আপনাদের সামনে তুলে ধরা। ঐতিহাসিকগণ যেখানে রিবয়ী ইবনে আমের (রা.) এর এই কাহিনী উল্লেখ করেছেন, সেখানে তারা এ কথাও লিখেছেন যে, মুসলিম প্রতিনিধি দলকে যাতে প্রভাবিত করা যায় এবং তাদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়া যায়, এই অভিপ্রায়ে পারসিকরা জৌলুসপূর্ণ বিশাল সভাকক্ষ তৈরী করে মেঝে ও আগমন পথে মূল্যবান গালিচা বিছিয়ে দেয় এবং আলোকসজ্জারও ব্যবস্থা করে। কিন্তু রিবয়ী (রা.) এতে কোনরূপ প্রভাবিত না হয়ে হাতে খঞ্জর নিয়েই সভাকক্ষে প্রবেশ করতে লাগলেন।
প্রহরীরা বলল, আপনি খঞ্জর রেখে আসুন।
রিবয়ী ইবনে আমের (রা.) বললেন ঃ আমি তোমাদের কাছে আসিনি। আমি হয় এই হাতিয়ার নিয়েই প্রবেশ করব, নতুবা আমি স্ব-শিবিরে ফিরে যাব।
এ কথু শুনে প্রহরীরা খামোশ হয়ে গেল এবং সভাকক্ষে প্রবেশ করার জন্য অনুরোধ জানালো। পরে তিনি খঞ্জর ও সাওয়ারী নিয়েই রুস্তমের দরবারে প্রবেশ করলেন। তারা তাকে কাবু করার জন্য যে গালিচা বিছিয়েছিল, তা খঞ্জর দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং মঞ্চে পৌঁছে সাওয়ারীটি রুস্তমের পাশেই বাঁধলেন।
তিনি তার এ আচরণে এ কথাই বুঝিয়ে দিলেন, আমার সাথে যা আছে, তা সহকারেই আমাকে বরণ করতে হবে, নতুবা আমি ফিরে যাব। কারণ, তোমরা আমাকে আমন্ত্রণ করে এনেছ, আমি স্বেচ্ছায় তোমাদের কাছে আসিনি।
আজও মুসলিমরা কাফিরদের কাছে যায়, কিন্তু ইজ্জতের সাথে নয়, বরং দুর্বল ও পরাজিত মনোভাব নিয়ে।

সপ্তম লক্ষণ ঃ আশা-আকাংখার সংকীর্ণতা

অনেক উলামায়ে কেরাম এমন রয়েছেন, যাদের আকাংখা অত্যন্ত সংকীর্ণ। এমন উচ্চাকাঙ্খী আলেম খুব কমই আছেন, যিনি এই দ্বীনকে সমগ্র বিশ্বে প্রচার, প্রসার ও বাস্তবায়ন করার আশা পোষণ করেন। তারা উচ্চাকাঙ্খা ও বুলন্দ হিম্মত হারিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ আশা-আকাঙ্খা নিয়েই পরিতৃপ্ত থাকেন।
যারা দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করেন, তাদের অবস্থাও তথৈবচ। সীমাবদ্ধ কিছু ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করাকেই তারা যথেষ্ট মনে করেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত দ্বীনের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের মহৎ ইচ্ছা ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অনেকের মাঝেই নেই। অথচ শরীয়তসম্মত বিষয়ে অন্তরে উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করা একটি প্রশংসনীয় ও কাম্য বিষয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মু’মিনদের এই গুণের প্রশংসা করে বলেছেন ঃ

“যারা (রহমানের বান্দা) বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন যাদের দেখে আমাদের নয়ন জুড়ায় এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ করুন। (সুরা আল-ফুরক্বানঃ৭৪)

এখানে প্রথভ্রষ্টদের নয়, সাধারণ নেককার মুসলিমদেরও নয়, বরং মু’মিনদের মধ্যেকার মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ ও ইমাম হতে যারা প্রত্যাশী, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। বস্তুতঃ এ ধরনের প্রত্যাশা উচ্চ মনোবলের পরিচায়ক। আর তা অর্জন করার জন্য চাই কার্যকরী পদক্ষেপ ও পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ।
বর্তমান মুসলিমদের এ ধরনের উচ্চাকাঙ্খা পোষণ না করার পিছনে একটি কারণ রয়েছে। তা হলো শিক্ষার্থী ও মুসলিম যুবকগণ তাদের চিন্তা-চেতনাকে এই বৃত্তে আবদ্ধ করে ফেলেছে যে, তাদের প্রকৃত আদর্শ হল সমাসাময়িক কোন ব্যক্তিত্ব, বা তার জীবন গঠনে যার ভূমিকা রয়েছে। যেমন তার উস্তাদ বা কোন নেতা। কিন্তু সে প্রকৃত আদর্শ হিসাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নির্ধারণ করেনি। শুধু তাই নয়, বরং এই শিক্ষার্থী স্বীয় উস্তাদ হতে অগ্রগামী হওয়ার কল্পনাতো করেই না, অধিকন্ত এ জাতীয় উচ্চাকাঙ্খা পোষণ করাকে উস্তাদের সাথে চরম বেআদবী মনে করে। সে দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে, তার উস্তাদ এমন স্তরে পৌঁছে গেছেন যেখানে পৌঁছা তার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। ফলে সে যদি কখনও কোন বিষয়ে তার উস্তাদকে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেখে তখন সে উস্তাদের সাথে সে বিষয়ে আলোচনা করাকে বেআদবী ও মানহানিকর মনে করে। সে মনে করে যে, উস্তাদের সিদ্ধান্তই হয়ত সঠিক। অথচ তার এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমরা যদি এ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করি যে, “ছাত্র তার উস্তাদ থেকে বড় হতে পারে না” তাহলে তো মুসলিমদের ক্রমশ অধঃপতনই হতে থাকবে। কারণ, উস্তাদ যদি বিদ্যা-বুদ্ধিতে এক স্তরে থাকেন, তবে তার ছাত্র হবে তার চেয়ে নিম্ন স্তরের, ছাত্রের ছাত্র হবে তার চেয়ে নিম্ন স্তরের। এভাবে নিম্নমুখী হতে হতে এক সময় সাধারণ মানুষের সাথে একাকার হয়ে যাবে।
এ ধরনের চিন্তাধারা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। মুসলিমরা যদি তাদের মানসিকতাকে এ ধরনের চিন্তাধারায় সীমাবদ্ধ করে রাখে, তাহলে কোন ক্ষেত্রেই তাদের উন্নতি ও অগ্রগতি করা সম্ভব হবে না। এ ধরনের মনোভাব পোষণ করা হীনমন্যতা ও বিপর্যস্ত মানসিকতার পরিচায়ক। ছাত্র যদি উস্তাদ হতে বড় হয়ে যায়, তাতে উস্তাদের মর্যাদাহানী হয় না, বরং তা উস্তাদের জন্য সম্মানজনক ও গৌরবের বিষয়।
আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনারা কি বলতে পারেন, শায়খুল ইসলাম (র.) এর উস্তাদ কারা ছিলেন? ইমাম বুখারী (র.) এর উস্তাদ কারা ছিলেন? কারা ছিলেন ইমাম মুসলিম (র.) এর উস্তাদ? এ ইমামত্রয়ের প্রত্যেকেই ছিলেন ইসলামী জ্ঞানের আকাশের এক-একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। অমর কীর্তির কারণে তাদের সুনাম দিগন্ত প্রসারিত, তাদের খ্যাতি আকাশচুম্বি। কিন্তু কারা তাদের উস্তাদ, সে খবর অনেকের কাছে নেই।
কাজেই আমাদের উপরোক্ত ধারণা যদি ঠিক হত, তাহলে আমি বলব, শায়খুল ইসলাম, ইমাম বুখারী (র.) ইমাম মুসলিম (র.) কখনও এত বড় হতে পারতেন না।

অষ্টম লক্ষণ ঃ স্ব-ধর্মকে নানাবিধ অভিযোগের শিকার মনে করা

এ লক্ষণটি সাধারণতঃ এমন কিছু মুসলিম লেখক ও যুবকদের মাঝে পরিলক্ষিত হয়, যারা পাশ্চাত্য পন্থীদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ ক্ষেত্রে কিছু মুসলিম লেখকের শুধু ইসলামের উপর আরোপিত বিভিন্ন অভিযোগ-অপবাদের খন্ডনমূলক লেখা লিখতে থাকে। মনে হয় যেন তারা অপবাদের জিঞ্জিরে আবদ্ধ। ফলে তাদের সব লেখাই হয় প্রতিবাদমূলক। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন নয়টি বিয়ে করলেন? ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি কেন দেয়া হল? চোরের হাত কাটা হয় কেন? এই বিধান এমন কেন? বিবাহিত ব্যভিচারীকে মৃত্যুদন্ড কেন? এই বিধানের হিকমত বা যুক্তি কি? এই ধরনের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতেই তারা বেশী ব্যস্ত থাকে।
অবশ্য কেউ যদি এ সম্পর্কে জানতে চায় তাহলে তার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়ার জন্য জবাব প্রদানের কথা ভিন্ন। কিন্তু কারো সাধারণ অভ্যাস যদি এমন হয়, তাহলে এটা হবে তার দুর্বল মনোভাব ও পরাজিত মানসিকতার লক্ষণ।
অনুরূপ ভাবে এক শ্রেণীর যুবক, বিশেষ করে যারা পশ্চিমা দেশ গুলোতে যাতায়াত করে, তারা যখন ভিন্ন ধর্মের লোকদের মুখোমুখি হয়, তখন অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত হয় এবং ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধানের হেকমত ও যুক্তি নিয়ে আলোচনা করাকে প্রাধান্য দেয়। তাদের ধারণা হল, এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে ইসলাম সম্পর্কে পশ্চিমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গিকে নিমিষেই দূর করে দেয়া যাবে। অথচ তাদের এ ধারণা ভুল। কারণ, পশ্চিমারা কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। তাদের অভিযোগ যতই খন্ডন করা হোক না কেন, তাদেরকে কখনই সন্তুষ্ট করা যাবে না। তাদের অভিযোগের একমাত্র জবাব হল, শরীয়ত অনুযায়ী আমল ও তার সফল বাস্তবায়ন। কারণ পূর্ণাঙ্গ শরীয় অনুযায়ী আমল করার ফলে আমাদের সমাজের শান্তি শৃংখলা যখন তারা অবলোকন করবে এবং ইসলামের সৌন্দর্য, সত্যতা ও সার্বজনীনতা বুঝতে সক্ষম হবে, তখন তারা নিজেদের ভ্রান্ত মতবাদের কুফল প্রত্যক্ষ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিবে। এছাড়া তাদেরকে অন্য পন্থায় সন্তুষ্ট করা যাবে না।
সাইয়্যিদ কুতুব শহীদ (রঃ) তাদের অভিযোগ খন্ডাতে অভিযুক্ত বিষয়ের হেকমত দর্শানোর পিছনে না পড়ে ভিন্ন একটা পন্থা অবলম্বন করতেন। তিনি তার লেখনিতে উল্লেখ করেন, যখন তিনি আমেরিকায় অবস্থান করতেন, তখন তার সমসাময়িক লেখকগণ পশ্চিমাদের  বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্নের জবাব দিলেও তিনি জবাব দানে বিরত থাকতেন, বরং তিনি পশ্চিমাদের ধর্ম-বিশ্বাস ও জীবনাচার সম্পর্কে পাল্টা অভিযোগ তুলতেন।
সাইয়্যিদ কুতুবের ভূমিকাটি অত্যন্ত সুন্দর। তার দৃষ্টান্ত এমন যে ধরুন, কোন ব্যক্তি আপনার প্রতি অস্ত্র তাক করে আছে, তখন আপনার প্রথম কর্তব্য হবে তাকে নিরস্ত্র করা। অতঃপর আলোচনার মাধ্যমে আপনার যুক্তি দর্শন তার সামনে তুলে ধরা। কাজেই পশ্চিমাদের নীরব করার উত্তম পন্থা হলো, উত্থাপিত অভিযোগের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে পাল্টা তাদের ধর্ম ও জীবনাচারের উপর অভিযোগ করা। এতে তারা তাদের ধর্ম বিশ্বাস ও জীবনাচার তা মোটেও যুক্তিগ্রাহ্য নয়, বরং তা একেবারেই কল্পনা প্রসূত। তা বুঝতে সক্ষম হবে। কিন্তু আফসোস! আমাদের ভূমিকা এমন শক্তিশালী হচ্ছে না। আমরা শুধু পরাজিত ব্যক্তির ন্যায় আত্মরক্ষার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রয়েছি।

নবম লক্ষণ ঃ বিশ্বময় আল্লাহর দ্বীন প্রচারে শিথিলতা ও অলসতা

এ লক্ষণটি দেখা যায় দুর্বল ঈমানের অধিকারী এক শ্রেণীর মুসলিমদের মাঝে, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কিছু ভবিষ্যদ্বাণীর ভূল ব্যাখ্যার শিকার হয়েছে, যে সব ভবিষ্যদ্বাণীতে মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন ও নৈতিক অবক্ষয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ সহীহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীস পেশ করা যাক।
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

“এমন একটি যুগ অতি নিকটবর্তী, যখন মুসলিমের সর্বোত্তম সম্পদ হবে বকরি, যা নিয়ে সে পর্বত শৃঙ্গে ও বারিপাতের স্থানসমূহে আশ্রয় নিবে এবং ফিৎনা হতে বাঁচার জন্য সে দ্বীন নিয়ে পলায়ন করবে।” (বুখারী ঃ ২/৯৬১)

দুর্বল মনের লোকেরা সমাজ-সংস্কারের বিষয়ে নিরাশ হয়ে এই মর্মের হাদীসগুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করতঃ লোকালয় হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে বৈরাগ্য জীবন যাপনের প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠে। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত অন্য একটি হাদীসও তারা দলিল হিসাবে পেশ করে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ

“তোমরা আল্লাহর কাছে প্রার্তাবর্তন করার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি মুহুর্তেই পূর্বের চেয়ে খারাপ হতে থাকবে।” (বুখারী ২/১০৪৭)

এই মর্মের হাদীসগুলো দেখে নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। কেননা নৈরাশ্যবাদীরা হাদীসগুলোকে যেমন ব্যাপক মনে করে থাকে, প্রকৃতপক্ষে হাদীসগুলো তেমন ব্যাপক নয়। হাদীস বিশারদগণ এই মর্মের হাদীসসমূহের বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে প্রায় সকলেই বর্ণিত পরিস্থিতিকে বিশেষ যুগের সাথে সীমাবদ্ধ করেছেন। যেমন অনেকেই বলেছেন, এ হাদীসসমূহ খিলাফতে রাশেদার পরবর্তী একটি বিশেষ যুগের দিকে তথা হাজ্জায ও ইয়াজিদের শাসনকালের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। তাদের যুগটা এমন ভাবে অতিবাহিত হয়েছিল যে, জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত পূর্বের চেয়ে শোচনীয় ছিল। হাদীসসমূহে সর্বযুগের কথা বলা হয়নি বিধায় এ কঠিন যুগ পেরিয়ে পুনরায় খেলাফতে রাশেদার সাদৃশ্যে উমর ইবনে আব্দুল আজিজের স্বর্ণোজ্জ্বল খেলাফতকাল উম্মতের উপর অতিবাহিত হয়েছিল।
আল্লামা শায়েখ আলবানী (র.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, হাদীসটিকে অন্যান্য হাদীসের আলোকে পর্যালোচনা করলে সুস্পষ্ট ভাবে বুঝে আসে যে, উপরোক্ত হাদীসসমূহে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবাগণকে অতি নিকটবর্তী এক দুঃসময়ের প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে সতর্ক করে গেছেন। সাথে সাথে অন্য হাদীসে এই সু-সংবাদও দিয়ে গেছেন যে, সমাগত অত্যাচারী শাসনের অবসান ঘটবে এবং খেলাফতে রাশেদার নমুনায় ইনসাফপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। এই সু-সংবাদ যখন অন্যান্য হাদীসে সুস্পষ্ট, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, উপরোক্ত হাদীসগুলোতে সর্বকালের কথা বলা হয়নি। তাই উসুলে ফিকহর পরিভাষায় এই হাদীসকে বলা হবে ঃ عام خاص منه البعض অর্থাৎ হাদীসটি শাব্দিকভাবে ব্যাপক হলেও তার ব্যাপকতা উদ্দেশ্য নয়, বরং বিশেষ ক্ষেত্রের সাথে সীমাবদ্ধ।
মোট কথা, উক্ত হাদীসগুলো ব্যাপক নয়। তাই স্থান বিশেষ কখনো পরিস্থিতির নাজুকতার কারণে নির্জনতা অবলম্বন জরুরী হলেও তা কেবল সাময়িক সময়ের জন্য হতে পারে। কেয়ামত পর্যন্ত সর্বকালে নির্জনবাসের মনোবৃত্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পর্যাপ্ত ত্যাগ স্বীকার করলে আজও খেলাফতে রাশেদার মত ইনসাফপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসে তার প্রতিশ্র“তি রয়েছে এবং ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও এর বাস্তবতা লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং উক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর ভুল-ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে হীনমন্য হওয়ার কোন কারণ নেই।

দশম লক্ষণ ঃ মানব রচিত আইন বাস্তবায়নের চেষ্টা করা

এক শ্রেণীর মুসলিম এমনও আছে, যারা জীবন-ব্যবস্থা হিসাবে আল্লাহ প্রদত্ত আইনের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল নয়। ফলে তারা মানব রচিত বিভিন্ন মতবাদের দিকে ঝুকে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালায়। ইতিমধ্যে তারা মুসলিম আধ্যুষিত অনেক রাষ্ট্রে মানব রচিত মতবাদ বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা দ্বীন ইসলাম পরিত্যাগ করে অন্য কোন মতবাদকে জীবন-ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করা এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, তাদের কাছে যে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান রয়েছে তাতে তারা সন্তুষ্ট নয়। ইসলামকে বর্জন করে মানব রচিত আইন গ্রহণ করার কারণেই তারা আজ সামগ্রিকভাবে অধঃপতন ও বিপর্যস্ততার এই স্তরে এসে উপনীত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, দ্বীন সম্পর্কে এহেন ধারণা পোষণ করা কুফরী। আল্লাহ আমাদেরকে এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে রক্ষা করুন এবং সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন!
bnislam.com
সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ