বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
শেখ হাসিনার ‘ফটোজেনিক মেধাবী’ জিনিসটি আসলে কী?  » «   সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে হবে : শিবির সভাপতি  » «   খালেদার বক্তব্য বিকৃত করে রায় দিয়েছেন আখতারুজ্জামান!  » «   একজন ভাষাসৈনিক গোলাম আজম এবং আমার ভাবনা  » «   আগামী বছর নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি  » «   ধনীদের আরো বেশি কর দেয়া উচিত: বিল গেটস  » «   খালেদা ভোটের যোগ্যতা হারালে কিছু করার নেই: কাদের  » «   তারেকের স্ত্রী, কন্যার ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদনের খবর  » «   খালেদার জামিন আবেদনের আগেই কপি চান অ্যাটর্নি জেনারেল  » «   ব্যাংকে জালিয়াতির কোনো ঘটনায় ছাড় দেয়া হয়নি: তোফায়েল  » «   বাংলাদেশকে কেউ আর অবহেলার সাহস পায় না: প্রধানমন্ত্রী  » «   বাসের ধাক্কায় ৪ অটোযাত্রী নিহত  » «   ২১ গুণীজনকে একুশে পদক দিলেন প্রধানমন্ত্রী  » «   ভারতের দুর্ভাগ্য যে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় আছে: মমতা  » «   খালেদা জিয়ার আপিল গ্রহণের শুনানি বৃহস্পতিবার  » «  

রোহিঙ্গারাও কি বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটি

unnamed-1-1

রায়হান আহমেদ তপাদার :  বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত এই জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি কমই পেয়েছে তারা। অনস্বীকার্য যে মিয়ানমারে জাতিগত নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা কয়েক যুগ ধরেই বাংলাদেশে আসছে। মিয়ানমারের এ পরিকল্পনা সফল হতে দিলে বাংলাদেশের সমূহ ক্ষতির কারণ হবে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয়টি মানবিক এবং দেয়াও উচিত, দিচ্ছেও। আর এ সুযোগটিই নিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। এইচআরডব্লিউ বলছে,বাংলাদেশের উচিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গ্রহণ করা ও তাদের সুরক্ষা দেয়া।এমন উচিতটা বুঝলেও এইচআরডবিস্নউ মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে সুস্পষ্ট কোনো আহ্বান জানাননি বরং তারা তাদের ওয়েবসাইটে বলেছেন, মিয়ানমারে সহিংসতার অর্থ হলো বাড়ি ফিরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। বিষয়টি মিয়ানমার সরকারের কর্মকান্ডকেই সমর্থন করে বৈকি। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা উচিত ছিল। তা তারা করেনি। তাদের এমন মৌন সমর্থনের ফলে মিয়ানমার সরকারের বোধোদয় হবে না কখনোই।প্রশ্ন হলো, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বর্তমান সংকটের সমাধান কিভাবে হতে পারে? মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। অতীতে অনেক দেশেই এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এর আগে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে জাতিসংঘ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। সিরিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এখন মিয়ানমারের ওপর যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তাহলে সম্ভবত তাদের বোধোদয় হবে। নইলে হবে না। এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ কি আদৌ হবে? যদি না হয় বিশ্ব মুসলিমদেরই জাগতে হবে।

মানুষের মধ্যে এখন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে উদ্বেগ আছে। এ বিষয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন,একই সঙ্গে ক্ষুব্ধও। শান্তিতে নোবেল প্রাইজ জয়ী অন সান সু চি রোহিঙ্গা নির্যাতনকে কিভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন, বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। এ নিয়ে তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা ঘৃণিত। তিনি আরও বলেছেন, ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের সরকার উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ, আমরা মনে করি,এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা সম্পর্ক ভালো রাখার চেষ্টা করছি।রোহিঙ্গা ইস্যুটি আমাদের জন্য খুবই সংবেদনশীল। এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ঘোষণা অনুযায়ী জন্মমাত্রই সকল মানুষ নিরাপদে এবং একটি নাগরিক পরিচয় নিয়ে বসবাস করার অধিকার প্রাপ্ত। রাজনৈতিক বিবেচনায় সেই অধিকার কেড়ে নেয়া বা সেই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করাটা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কোন ভূখন্ডে বা কোন দেশে এই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে অপরাপর রাষ্ট্রসমূহের উচিত তাদের সহায়তার হাত প্রসারিত করা এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিষয়টির নিষ্পত্তিতে তৎপরতা বৃদ্ধি করা।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এমন বিপর্যয় ঘটেছিল এবং প্রতিবেশী হিসেবে ভারতসহ বহুদেশ আমাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের বহু মানুষ মিয়ানমার সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। ক্রান্তিকালে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেয়ার এই রীতি সবখানেই বিরাজমান।মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা বলে পরিচিত জনগোষ্ঠী এবারই প্রথম এমন মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে এমন নয়। এর পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গত বছরের শুরুতেও সেখানে ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল।

অপরদিকে আমেরিকান প্রভাবশালী টিভি সিএনএন-এ সে সময়ের বিভৎসতার কাহিনী তুলে ধরে শিরোনাম করা হয়েছিল সুচি কি শুনতে পাচ্ছেন?উক্ত প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতন সম্পর্কে বলা হয়েছিল,সব বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে? মৃতদেহ এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে? এমন বিভৎসতা চোখে দেখা যায় না?এবারেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। প্রতিদিন শত শত নারী ও শিশু নাফ নদী দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে কিন্তু আমাদের সীমান্ত রক্ষীরা তাদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।ফলে নদীতে লাশ হচ্ছে কেউ কেউ আর অসংখ্য মানুষেরা সীমান্তের নো ম্যান্স ল্যান্ডে অমানবেতর জীবনযাপন করছে। যেভাবে খবর আসছে তাতে বিবেকসম্পন্ন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে শান্তির দূত হয়ে অশান্তির আগুনে কি সু চি তেল ঢালছেন?বৃটিশ আমল থেকেই মিয়ানমারে রোহিঙ্গা-রাখাইন হিংসার আগুন জ্বলছে। মাত্র আটলাখ রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ পরিচয়’ আজও অমিমাংসিত।মিয়ানমারের নাগরিক আইন অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা সেদেশের নাগরিক নয়? সে হিসেবে তারা এক রাষ্ট্রহীন জাতি? উল্লেখ্য, মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে গত কয়েক দশকে চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে? এর মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার? আর অনিবন্ধিত প্রায় ৪ লাখ? বাংলাদেশ সরকার আর কোন রোহিঙ্গাকে এদেশে আশ্রয় দিতে রাজি নয়?গত বছরে ভারতের এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সু চি প্রশ্ন তুলেছিলেন,রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে গেছে,না মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে গেছে?

উল্লেখ্য,বিশ্ব মানচিত্রে আরাকান বলে একটা রাজ্য ছিল। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত। বঙ্গোপসাগর এবং নাফ নদীর দক্ষিণ-পশ্চিম মোহনা-বেষ্টিত আরাকান-ইয়োমা নামের দীর্ঘ পর্বতশৃঙ্গ আরাকানকে মায়ানমারের অন্যান্য অংশ থেকে আলাদা করেছে। সামরিক ফরমান জারি করে যেভাবে বার্মার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে,একইভাবে আরকান নাম পরিবর্তন করে রাখাইন রাজ্য করা হয়েছে।রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমারের বর্তমান রাখাইন রাজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, বৃটিশ আমলে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের অধিবাসী বাঙালিরা আরাকান রাজ্যে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীতে তারা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত হয়। ১৬৬৬ সালে আরাকান রাজ্য সংকুচিত হয়ে একটি ছোট্ট অঞ্চলে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক ভাবে বেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ১৮২৬ সালে এটি ব্রিটিশ ডোমিনিয়নের অংশে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এটি সাময়িকভাবে জাপানের দখলে ছিল। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের আগেও বার্মায় আরাকানি বৌদ্ধ এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগত। ভারতবর্ষের মতই শাসকরা সেখানেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা জিইয়ে রেখে বা উস্কানী দিয়ে বৃদ্ধি করে নিজেদের শাসন পরিচালনা করত।১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৪৭ সালে রোহিঙ্গারা মুজাহিদ পার্টি গঠন করে। মুজাহিদ পার্টির লক্ষ্য ছিল আরাকানে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তারা জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। কিন্তু জেনারেল নে উইন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পরে রোহিঙ্গাদের উপর দুর্ভোগ নেমে আসে।

বার্মার সামরিক সরকার রোহিঙ্গারাদের সদ্য অভিবাসিত একটি উপজাতি হিসেবে গণ্য করে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়।জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী। শোনা যায়,বার্মার মুজাহিদরা আরাকানের দূর্গম এলাকায় এখনও সক্রিয় আছে এবং তারা স্বাধীন আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। চলমান সঙ্কটের নেপথ্যে সেটাও একটা বড় কারণ বলে মনে করা হয়। যদিও গণমাধ্যমে এই প্রসঙ্গটি খুব বড় করে আলোচনায় স্থান পায় না।রোহিঙ্গা ইস্যুটি খুবই জটিল, কেননা এর শেকড় অনেক গভীরে। কয়েকশ বছর আগে থেকে বৌদ্ধ এবং মুসলমানদের ধর্মীয় সংস্কৃতি নিয়ে বিরোধ শুরু হলেও বর্তমানে এর সাথে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানে অস্বীকৃতি এবং স্বাধীন আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। রাজনীতিতে সকলেই নিজেদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। সেখানেও এর ব্যতিক্রম নয়। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অপর কোন জনগোষ্ঠীকে অবদমিত করার বাইরে কেউ যেতে পারে না। শান্তিতে নোবেল জয়ী, একদা গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ খ্যাত অহিংস নেত্রী সু চিও সেটা পারছেন না।আমরা বাংলাদেশের নাগরিকেরাও কি পারছি আমাদের সীমান্ত খুলে দিয়ে দুর্ভাগা এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে! ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন আমেরিকার দরজা অভিবাসীদের জন্য বন্ধ করেন তখন আমরা জোরসে তার সমালোচনা করি। সংবাদপত্রের শিরোনাম হওয়া শিশু আয়লানের মৃতদেহটি তখন সকলের আলোচ্য সূচীতে পরিণত হয়। কিন্তু একইভাবে আমাদের নাফ নদীতে যখন একের পর এক শিশুর মৃতদেহ ভেসে আসে তখন আমরা নিশ্চুপ থাকি! দোষ দেব কাকে?রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাঁচিয়ে রেখে কোন কোন মহল রাজনীতির দাবা খেলছেন। জাতি বিদ্বেষ,দাঙ্গা কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। সংকটগুলো রাজনৈতিক। নিজেদের স্বার্থে এসব সংকট সৃষ্টি করা হয় এবং জিইয়ে রাখা হয়। শুধু মিয়ানমার নয় বিশ্বের দেশে দেশে আজ একইভাবে সাধারণ মানুষের উপর নৃশংস হামলা চলছে। মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে। তাই মাথা বা শীর্ষ পর্যায়ের এই সাম্প্রদায়িক মনোভাব, জনপ্রিয়তা লাভের সস্তা সাম্প্রদায়িক উসকানী দিয়ে যারা পচনের রাজনীতি করেন,তাদের থেকে সাবধান!
লেখক ও কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com

সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ