বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করবে ওআইসি  » «   অভিশপ্ত চেয়ার: বসলেই মৃত্যু নিশ্চিত  » «   আমেরিকায় গিয়ে জঙ্গি হয়েছে আকায়েদ: পুলিশ  » «   সেনা চৌকিতে ধরা পড়া সেই ৭ ডিবি বিচারের মুখোমুখি  » «   মুসলমান কেন নির্যাতিত হচ্ছে এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সা. এর ভবিষ্যদ্বাণী  » «   সিলেটে যে অস্ত্রে কাবু রাজনীতিকরা  » «   আমেরিকায় বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা  » «   ১৫৪ এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, এটা কি গণতন্ত্র: প্রশ্ন বি. চৌধুরীর  » «   শিবির তাড়িয়ে ওসমানী মেডিকেলে ছাত্রাবাসের কক্ষ দখলে নিল ছাত্রলীগ  » «   আমেরিকায় বন্ধ হচ্ছে পারিবারিক চেইন ভিসা!  » «   শৃঙ্খলা বিধিমালায় খর্ব হয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা  » «   ফের বৃটেনের ভ্রমণ সতর্কতা, জনসমাগমে হামলার শঙ্কা  » «   ফাতাহ ও হামাসকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান পুতিনের  » «   টঙ্গীতে প্রবাসী দুই ভাইকে ছুরিকাঘাতে হত্যা  » «   ‘তন্নতন্ন করেও জামায়াত-শিবিরকে ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নের প্রমাণ পাইনি’  » «  

আমরা পথ হারিয়েছি

aka

ডা: ওয়াহিদুজ্জামান:  চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইউরোপে শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের অগ্রগতির প্রভাবে মানুষের চেতনার জগতে ‘রেনেসাঁ’ নামে যে নবজাগরণ শুরু হয়েছিল, সে জাগরণ চার্চের ধর্মগুরু ও রাজাদের অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে রূপলাভ করে। রোমান ক্যাথলিক মতবাদের কুসংস্কার ও ধর্মগুরুদের অবিচারের বিরুদ্ধে ‘প্রোটেস্ট্যান্ট’ বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং নতুন খ্রিষ্টান মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও লোভ, ক্রোধ, যৌনতা, অহঙ্কার ইত্যাদি আবেগ-প্রবৃত্তির অনুসরণ না করে, বিবেকবান নীতিবান মানুষ গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই নবী-রাসূল বা ধর্মের মূল উদ্দেশ্য।

যেমন- কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘হে যারা ঈমান এনেছো! তোমরা আল্লাহর সাক্ষী হিসেবে ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতার এবং আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়; … তোমরা ন্যায়বিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না…।’ (সূরা আন নিসা, ১৩৫) যিশুখ্রিষ্টও সে চেষ্টা করে গেছেন। তারপরও শুধু রোমান ক্যাথলিক নয়, প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের ধর্মগুরুরাও মানুষের বিবেক-নৈতিকতার দাবি অনুযায়ী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার ছিলেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু খ্রিষ্টান ধর্মই নয়, অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় নেতারাও বিবেক-নৈতিকতার চেয়ে ধর্মীয় আচার-রীতিনীতি বা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে বেশি মূল্য দিতে শুরু করেন। ফলে তখন মানুষের কাছে ধর্ম বা ধর্মীয় নেতাদের মূল্য কমে যায় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর ধর্মগুরুদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়। পরে ১৭৮৩ ও ১৭৯৯ সালে এ নবজাগরণ আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ বা রাষ্ট্রপদ্ধতিতে রূপলাভ করে। সৃষ্টি হয় ধর্মনিরপেক্ষবাদ ও জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু বিবেকহীন, নীতিহীন, লোভী মানুষ সুকৌশলে শিল্পবিপ্লবে অর্জিত বিপুল এ ধনসম্পদ অধিকার করে ভোগ করতে থাকে। সাধারণ মানুষ এ সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে দিন দিন গরিব হতে থাকে। এরা জিম্মি হয়ে শাসিত ও শোষিত হতে থাকে। গরিব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর চীনসহ পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয় ও সমাজতান্ত্রিক শাসন গড়ে ওঠে। সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থ্যা শিল্পবিপ্লব বা সম্পদ উৎপাদনে ততটা সফল হতে পারেনি বলে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো দরিদ্র রয়ে যায়। তা ছাড়া সম্পদের সুষম বণ্টনেও তারা ততটা সফল হতে পারেনি।

ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা আত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধের নিয়ন্ত্রণও সমাজ থেকে কমে গেছে। এ সময় থেকে বিবেক ও নৈতিক মূল্যবোধের পতন ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে, যা দিনে দিনে আধুনিক সভ্যতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। যে কারণে আধুনিক সভ্যতার আইনকানুন বিবেকহীন, নৈতিকতাহীনভাবে নিজেদের ইচ্ছা বা খায়েশ পূরণ করাকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন : সমকামী বিবাহ, পরকীয়া প্রেম ও যৌন সম্পর্ক, মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে অন্যকে শোষণ করা ইত্যাদি। আত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ উন্নত হওয়ার কারণে সত্যিকার ধার্মিক মানুষ শুধু মানুষের অধিকারই নয়, সব জীবের অবদান ও অধিকারকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করে। মানবতাবাদী হওয়ার কারণে মানুষ অন্য জীবের অধিকারের চেয়ে নিজেদের অধিকারকে অযথা বড় করে দেখে। মানুষ আরো সঙ্কীর্ণ ও স্বার্থপর হয়ে জাতীয়তাবাদী হয়, তখন অন্য সব জাতির মানুষের অধিকারের চেয়ে নিজের জাতির অধিকারকে বিবেকহীনভাবে বড় করে দেখে। এ ছাড়া আত্মিক ও নৈতিক শক্তির অভাবে বর্তমান পৃথিবীতে অনিয়ন্ত্রিত লোভ, কামনা, ক্রোধ, অহঙ্কার, হিংসা ইত্যাদি আবেগ-প্রবৃত্তিগুলো সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে প্রতিবন্ধকতা বা সৃষ্টি করেছে। ফলে বিবেক-নৈতিকতার প্রবাহ কমে গিয়ে সুবিচার, গণতন্ত্র, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইত্যাদি কমে গিয়ে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা নষ্ট হয়ে সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পৃথিবীতে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে তারও একেবারে গোড়ায় রয়েছে এই বিবেক-নৈতিকতার বিপর্যয়।

শরীর ছাড়াও মানুষের রয়েছে একটি মন ও লোভ, ক্রোধ, যৌনতা, অহমিকা ইত্যাদি কিছু আবেগ ও সহজাত প্রবৃত্তি এবং একটি আধ্যাত্মিক সত্তা। এই আত্মিক চেতনা থেকে বিবেক, নীতিনৈতিকতা, সততা, পবিত্রতা, অঙ্গীকার ইত্যাদি নৈতিক মূল্যবোধ আত্মপ্রকাশ করে। আত্মিক মূল্যবোধ উন্নয়নের জন্য নবী-রাসূলগণ সৃষ্টিকর্তার কাছে সমার্পণের উপদেশ দিয়েছেন। সমার্পণ যেন সম্পূর্ণ বা পরিপূর্ণ হয়, তাই তাঁরা নিঃশর্ত ভক্তি ও কর্ম, জ্ঞান ইত্যাদি পথে ইবাদতের কথা বলেছেন। যেমন- কুরআনে আল্লাহ বলেন, হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, ঠিক যেভাবে করা ঊচিত এবং আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ সমার্পণকারী না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না, (সূরা ইমরান, ১০২)। এভাবে সমার্পণের মাধ্যমে আত্মিক চেতনা জাগরণের মাধ্যমে আত্মগঠন ও সমাগঠনই ছিল নবী-রাসূলদের বিপ্লবের মূলকথা। আত্মিক মূল্যবোধের প্রেরণা দিয়ে আবেগ-প্রবৃত্তি সুনিয়ন্ত্রিত করার ওপর ভিত্তি করেই এসব মহান বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। তবে বিপ্লবের পরবর্তীকালে এই মূল্যবোধকে যথেষ্ট মূল্যায়ন বা লালন করা হয়নি। ধর্মের আচার, রীতিনীতি তথা খোলসের মধ্য দিয়ে আত্মিক মূল্যবোধহীন অধার্মিক ও বকধার্মিক ধর্মীয় নেতা সৃষ্টি হয়েছে। এরাই ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধি করার জন্য বিবেক-নৈতিকতাকে বাদ দিয়ে ধর্মকে বিকৃত করেছে এবং এসব বিপ্লব ম্লান ও মূল্যহীন করে দিয়েছে।

এসব দেখে ধর্মের কার্যকারিতা নিয়ে আজ মানুষের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। বিভ্রান্ত হয়েছে মানবজাতি। বিবেক-নৈতিকতার নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে আবেগ-প্রবৃত্তির ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে আমরা হারিয়েছি পথ। এক ভয়াবহ বিপদের দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের এ পৃথিবী! বিপন্ন হতে চলেছে মানব সমাজ! সৃষ্টিকর্তার প্রতি পরিপূর্ণ সমার্পণের মাধ্যমে আজ আমাদের বিবেক-নৈতিকতাকে জাগানো প্রয়োজন। এই বিবেক-নৈতিকতার শক্তি দিয়ে আমাদের আবেগ-প্রবৃত্তিকে সুনিয়ন্ত্রিত করে সৎকর্মে প্রেরণা সৃষ্টি করা দরকার। এভাবে ধৈর্যের সাথে নিজ জীবনে বিবেক-নৈতিকতা ও সৎকর্মের উন্নয়ন এবং অন্য মানুষকে এ পথে আহ্বান করা সব ধর্মের ধার্মিক মানুষের পবিত্র দায়িত্ব।

লেখক : সিনিয়র কনসালটেন্ট, সিআরপি, সাভার, ঢাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ