বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা করবে ওআইসি  » «   অভিশপ্ত চেয়ার: বসলেই মৃত্যু নিশ্চিত  » «   আমেরিকায় গিয়ে জঙ্গি হয়েছে আকায়েদ: পুলিশ  » «   সেনা চৌকিতে ধরা পড়া সেই ৭ ডিবি বিচারের মুখোমুখি  » «   মুসলমান কেন নির্যাতিত হচ্ছে এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সা. এর ভবিষ্যদ্বাণী  » «   সিলেটে যে অস্ত্রে কাবু রাজনীতিকরা  » «   আমেরিকায় বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা  » «   ১৫৪ এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, এটা কি গণতন্ত্র: প্রশ্ন বি. চৌধুরীর  » «   শিবির তাড়িয়ে ওসমানী মেডিকেলে ছাত্রাবাসের কক্ষ দখলে নিল ছাত্রলীগ  » «   আমেরিকায় বন্ধ হচ্ছে পারিবারিক চেইন ভিসা!  » «   শৃঙ্খলা বিধিমালায় খর্ব হয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা  » «   ফের বৃটেনের ভ্রমণ সতর্কতা, জনসমাগমে হামলার শঙ্কা  » «   ফাতাহ ও হামাসকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান পুতিনের  » «   টঙ্গীতে প্রবাসী দুই ভাইকে ছুরিকাঘাতে হত্যা  » «   ‘তন্নতন্ন করেও জামায়াত-শিবিরকে ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নের প্রমাণ পাইনি’  » «  

ট্রাম্পের ঘোষণায় দুর্যোগ নামবে আরববিশ্বে রাশিদ খালিদি

233126kalerkantho-17-12-08-AK-12

নিজেকে অতিক্রম করার সক্ষমতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেই। প্রতিবারই এ অক্ষমতার পরিচয় দেন তিনি; বারবার একই কাজ করেন।

প্রায় সাত দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে এবার তিনি ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিলেন। এর ফলে নানা ধরনের নেতিবাচক ঘটনার জন্ম হবে। অনেক ঘটনাই ঘটতে পারে, যেসবের বিষয়ে ইঙ্গিত করা এ মুহূর্তে অসম্ভব।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যেসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ফয়সালায় পৌঁছতে পারেনি সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেরুজালেম। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনায় এ ব্যাপারে বারবার মতভেদ দেখা দিয়েছে। কারণ জেরুজালেম খুবই সংবেদনশীল প্রসঙ্গ। ফিলিস্তিনিদের আবেগ-অনুভূতিকে অগ্রাহ্য করে জটিল এই প্রসঙ্গে ঢুকে পড়লেন ট্রাম্প—যেন কোনো চায়না শপে ষণ্ড ঢুকেছে, সব তছনছ করে দিয়েছে।

নিঃসন্দেহে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেরুজালেম। এ শহর ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিস্টানদের পরিচয়ের মূল নির্ধারক বিষয়—ধর্ম দুটির আবির্ভাবের সময় থেকেই।

ফিলিস্তিন সংকট যত তীব্র হয়েছে, এ প্রসঙ্গের গুরুত্বও তত বেড়েছে।

জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে বিরোধ চরমে পৌঁছার কারণ দুই পক্ষের কাছেই এ শহর পবিত্র (মুসলিমদের জন্য হারাম আল শরিফ ও ইহুদিদের জন্য টেম্পল মাউন্ট)। সবিশেষ গুরুত্বের কারণেই কোনো ফিলিস্তিনি রাজনীতিক এর ব্যাপারে আপস করতে রাজি নন। আরব নেতাদেরও কেউ কেউ আপসে রাজি নন।

আমার মতো অনেকের কাছে, যাদের পরিবার-পরিজন কয়েক শ বছর ধরে জেরুজালেমে বাস করেছে বা করছে, ট্রাম্পের ঘোষণা শুধুই একটি ঘোষণা নয়। তিনি ইসরায়েলের অবস্থানকেই সমর্থন করেছেন। ইসরায়েলিরা মনে করে, জেরুজালেম শুধু তাদের। ১৯৬৭ সালে তারা আরব-অধ্যুষিত পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়, ট্রাম্প সেই দখলের বিষয়টিকেও বৈধতা দিয়েছেন। শুধু দখল নয়, পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের ওপর বৈষম্যমূলক আইনও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প যে ক্ষতি করলেন তা অপূরণীয়, এ ঘোষণা রদ করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর সম্ভব হবে না।

ট্রাম্পের ঘোষণার ফলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভূমিকার অবসান ঘটল। মধ্যস্থতার বিষয়ে একতরফা, একচেটিয়া দাবি ছিল তাদের। তাঁর জামাতা জারেড কুশনার ‘শান্তি পরিকল্পনা’ করছেন। মধ্যস্থতাকারীর ঐতিহাসিক দাবির সূত্রে এটিকে ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন কুশনার।

ট্রাম্পের ঘোষণা আরববিশ্বের মত প্রকাশের অধিকারকেই অগ্রাহ্য করল, জেরুজালেম প্রসঙ্গে আরবদেরও যে অভিমত আছে সে কথা কার্যত অস্বীকার করা হলো। আরব একনায়করা বা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী রাজারা যুক্তরাষ্ট্রকে যা-ই বলুক না কেন, জেরুজালেমের ব্যাপারে ফিলিস্তিনের দাবির প্রতি সমর্থন জোগাতে আরব জনগণ একাট্টা। ট্রাম্পের পদক্ষেপের বিষয়ে তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেই। ফলে পুরো আরব অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস ২০১৩ সালে বলেছিলেন, ‘কমান্ডার হিসেবে (সেন্ট্রাল কমান্ড) প্রতিদিন আমাকে মূল্য চুকাতে হয়েছে। কারণ ইসরায়েলের ব্যাপারে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবেই মার্কিনদের দেখা হয়েছে। ’

এই সর্বশেষ কূটনৈতিক বে-চালের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন গোটা বিশ্বের অভিমতকে অগ্রাহ্য করার, অবজ্ঞা করার চরম নজির স্থাপন করল। বিশ্বের আর কোনো দেশ জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী মনে করে না। এ ব্যাপারে বৈশ্বিক মতৈক্য রয়েছে। সেটি হলো, চূড়ান্ত ফয়সালা হওয়ার আগেই আলোচনার ফল নির্ধারণ করে ফেলা বেআইনি কাজ। এমনটি করা হবে না, এ আশ্বাস দিয়েই ১৯৯১ সালে মাদ্রিদ শান্তি সম্মেলনে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এ কথা বলতেই হয় যে ইসরায়েলের অনুকূলে, তাদের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। জেরুজালেম ইস্যুতে ইসরায়েল বা তাদের গুরু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পক্ষপাতহীন আচরণ আশা করা কারোরই উচিত নয়।

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার বিষয়টি এখন খুবই কঠিন হয়ে পড়ল। ট্রাম্পের পদক্ষেপ আত্মনিবর্তনের স্মারক, কূটনীতির দলিল-দস্তাবেজে এ ক্ষতের ছাপ দীর্ঘকাল থেকে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা এরই মধ্যে সংকুচিত। এ পদক্ষেপের ফলে মুসলিম ও আরবদের সঙ্গে এবং বিশ্বের শুভচিন্তার মানুষের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরো সংকুচিত হবে। আরব, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার জন্য বলেছিলেন। তিনি তাঁদের পরামর্শে কান দেননি। তিনি তাঁর সুহৃদ ও তাদের ইসরায়েলি চরমপন্থী সহমর্মীদের জন্য আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করেছেন বটে, কিন্তু ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানের বিষয়টিকে আরো কঠিন করে ফেলেছেন। এই আনাড়ি পদক্ষেপের কারণে ‘শতাব্দীর সেরা চুক্তি’তে উপনীত হওয়ার বদলে ‘শতাব্দীর চরমতম বিপর্যয়’-এ পৌঁছতে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর এই ঘোষণার দিনটি আন্তর্জাতিক আইনের জন্য, ফিলিস্তিনের জন্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি কামনাকারী সব মানুষের জন্য বেদনার দিন।

লেখক : ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন ইতিহাসবিদ নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান (অনলাইন সংস্করণ)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

kalerkantho

সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ