শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
নারী ধূমপায়ীদের তালিকায় বাংলাদেশ এখন শীর্ষে  » «   এবার বনানী থেকে শিক্ষা কর্মকর্তা নিখোঁজ  » «   মানুষ অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর নির্মম শিকলে বন্দী: খালেদা জিয়া  » «   আসামে বাংলাভাষী বিতাড়নের প্রতিবাদে বিক্ষোভ  » «   ইসরাইলী সেনার গুলিতে ১ ফিলিস্তিনী নিহত  » «   তীব্র সমালোচনার মুখে ছবিগুলো সরিয়ে নিলো ভারতীয় দূতাবাস  » «   নারায়ণগঞ্জে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বঙ্গবন্ধু সড়কে হকাররা  » «   আমরা লজ্জা পাচ্ছি, তারা কি পাচ্ছেন একটুও: আসিফ নজরুল  » «   সিলেটে অর্থমন্ত্রীর গাড়ি চাপায় আহত ২০  » «   জিয়ার মাজারের খালেদা জিয়ার শ্রদ্ধা নিবেদন  » «   সিলেট-লন্ডন ফ্লাইট চালু করতে ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্প  » «   মেয়র আইভী সিসিইউতে  » «   সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ৮০ ভাগ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিবে: মির্জা ফখরুল  » «   মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করছে সৌদি আরব: খামেনি  » «   বাবার লাশ নিয়ে এক তরুণের বাড়ি যাওয়ার মর্মান্তিক বর্ণনা  » «  

সাম্প্রদায়িক ভাষা সাম্প্রদায়িক সাহিত্য ও সাম্প্রদায়িক প্রশ্নপত্র

275740_146

ড. মোজাফফর হোসেন:  গত ২৫ অক্টোবর ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আই’ (চারুকলা অনুষদ) ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে (দুই নম্বর সেটে ৪১ ও ৭৬ নম্বরে) দু’টি সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন রাখা হয়েছে মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। প্রশ্ন দু’টি ছিল ৪১ নম্বর- ‘মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সশস্ত্র হামলা চালায় কত তারিখে? এবং ৭৬ নম্বর- বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোনটি? ৭৬ নম্বর প্রশ্নটির উত্তরের জন্য অপশন ছিল- ক. পবিত্র কুরআন, খ. পবিত্র বাইবেল, গ. পবিত্র ইঞ্জিল, ঘ. গীতা (গীতার সামনে পবিত্র লিখা হয়নি)। এই দু’টি প্রশ্নকে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন আখ্যা দিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো: মোস্তাফিজুর রহমান এবং একই অনুষদের প্রশ্ন প্রণয়নকারী শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক মো: জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

সেই অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৮ অক্টোবর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহাকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মো: শহীদুল্লাহ, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবু বকর মো: ইসমাইল ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। গঠিত কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৭৪তম সিন্ডিকেট সভার সুপারিশে অভিযুক্ত শিক্ষকদ্বয়কে শাস্তি হিসেবে আগামী ১০ বছরের জন্য পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং ডিন প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমানকে তার পদ থেকে অপসারণ ও মো: জিল্লুর রহমানের পাঁচ বছরের জন্য প্রমোশন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।

আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলিম-হিন্দু একত্রে মিলে মুক্তিযুদ্ধ করে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ দেশ ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ধারণ করেছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা ফিরিয়ে আনতে রক্ত দিতে হয়েছে, সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে একাত্তরে। সেই দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেয়া যায় না। কেউ তাতে উসকানি দেবে, সেটাও মেনে নেয়া যায় না। এ দেশে ধর্ম দিয়ে মানুষের পরিচয় নয়, মানুষ মানুষ হিসেবে তার পরিচয় বহন করবে। মানুষ মানুষ হিসেবে তাদের অধিকার ভোগ করবে। কাজেই সাম্প্রদায়িক যেকোনো কার্যক্রমকে প্রতিরোধ করাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এই চেতনা যেকোনো মূল্যে প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। এই বিশ্বাসের আলোকে চারুকলা অনুষদের প্রশ্ন দু’টি সাম্প্রদায়িক কি না তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

উল্লিখিত ৪১ নম্বর প্রশ্নটি ছিল- ‘মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সশস্ত্র হামলা চালায় কত তারিখে?’ এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো ২৫ আগস্ট। প্রশ্নটির সাম্প্রদায়িক অংশ হলো ‘মুসলমান’ এবং ‘বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী’। অর্থাৎ প্রশ্নটির মাধ্যমে এটি বোঝা যায়, ‘মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধরা হামলা চালিয়েছে’ আর এখানেই আপত্তি, এখানেই সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পাওয়া গেছে। এখানে মুসলমানেরা আক্রান্ত হয়েছে, সেটা সমস্যা হলেও বৌদ্ধরা আক্রমণ করে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে সেটাই বড় সমস্যা, আপত্তি সেখানেই। প্রশ্নটি যদি এমনভাবে তৈরি করা হতো যে, রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার জনগণ হামলা চালায় কত তারিখে? সম্ভবত প্রশ্নটি এমন হলে হয়তো সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন হিসেবে গণ্য হতো না। তবে এ কথা সত্য যে, বিশ্বব্যাপী মানুষ জেনে গেছে আরাকানের অধীবাসী যারা, তারা সবাই জাতিতে মুসলমান এবং বৌদ্ধরাই সেখানে জাতিগত নিধন চালিয়েছে। এ প্রসঙ্গে চারুকলা অনুষদের এই ৪১ নম্বর প্রশ্নটি যদি প্রণয়ন করা নাও হতো, তাহলে কি সেই সত্য ধামাচাপা দেয়া যেত? যেত না। এ প্রশ্নটি প্রণয়নের জন্য সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে একজন শিক্ষককে যদি অভিযুক্ত করা হয়, তাহলে এ দেশের ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার শত শত সাংবাদিককে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে আগে অভিযুক্ত করা যেতে পারে। কেননা, তাদের প্রকাশ করা রিপোর্টেই প্রথম বলা হয়েছে- মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিওগুলো গোটা বিশ্ব দেখে এসেছে এবং টিভির স্ক্রিনে যে খবর পরিবেশিত হয়েছে, পরিবেশিত সেই সত্য খবরগুলো সাম্প্রদায়িক কি না সেটাও প্রশ্ন হিসেবে সামনে আসতে পারে।

অভিযোগকৃত আরেকটি প্রশ্ন ছিল- ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোনটি? এই প্রশ্নটিকেও সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন ধরা হয়েছে। প্রশ্নটির উত্তরে অপশন হিসেবে চারটি ধর্মগ্রন্থের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিভাবে প্রশ্নটি সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে পড়ে তা অনেকেরই বুঝে আসে না। ধরে নেয়া যায়, ধর্ম একটি আপেক্ষিক বিষয়। সে হিসেবে একেকজনের কাছে একেক ধর্মগ্রন্থ শ্রেষ্ঠ। এ হিসেবে প্রশ্নটির সঠিক কোনো একটি উত্তর পাওয়া না-ও যেতে পারে। প্রশ্নকর্তা যদি মনে করেন, চারটি উত্তরের মধ্যে তিনি যেটিকে সঠিক মনে করেন সেটিতে যদি কেউ টিকচিহ্ন দেন, তাহলে সেটিকেই সঠিক উত্তর ধরে নেয়া হবে। তা হলে বলা যেতে পারে, এ প্রশ্নটি প্রস্তুত করা মোটেই ঠিক হয়নি। কারণ, এ প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। তাই বলে প্রশ্নটি সাম্প্রদায়িক হয়েছে এ কথা বলা যায় না কোনোক্রমেই; বরং বলা চলে ভুল হয়েছে। এ প্রশ্নটির সাম্প্রদায়িকতার অংশ হিসেবে সম্ভবত ধরে নেয়া হয়েছে যে, প্রশ্নকর্তা হয়তো শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম হিসেবে পবিত্র কুরআনের ওপরই টিকচিহ্ন চাচ্ছেন এবং গীতার সামনে পবিত্র না লিখে সে গ্রন্থটির অবমাননা করেছেন। কাজেই এ প্রশ্নটি সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন হয়েছে। এমন অভিযোগ হয়ে থাকলে কোনো জিনিসের শ্রেষ্ঠত্বের বিচার-বিবেচনাকে সাম্প্রদায়িক বলা যায় কি না ভেবে দেখা দরকার হতে পারে।

পৃথিবীতে অনেক বিষয়েরই শ্রেষ্ঠত্ব খোঁজা হয়। যেমন- পৃথিবীতে অনেক ভাষণ রয়েছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো ৭ মার্চের ভাষণ। তথ্যপ্রযুক্তির জগতে বহু রোবট তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ রোবট হচ্ছে সোফিয়া। পৃথিবীতে অনেক শোভাযাত্রা হয়েছে, বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা শ্রেষ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অনেক বীর রয়েছেন যেমন- বীর প্রতীক, বীরবিক্রম, বীর উত্তম তেমনিভাবে বীরশ্রেষ্ঠও রয়েছেন। এমনি করে শ্রেষ্ঠ জলপ্রপাত, শ্রেষ্ঠ দুর্যোগ ইত্যাদির যদি শ্রেষ্ঠত্ব থাকে, তাহলে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ থাকবে না কেন। যেকোনো দিক বিচারে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ পবিত্র কুরআন। এ গ্রন্থটি শুধু মুসলমানদের জন্য পথপ্রদর্শক নয়, এটি পৃথিবীর সব মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক। যারা এ গ্রন্থের নির্দেশ অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালিত করেন, তারা মুসলিম অভিধা পেয়ে থাকেন। এটিই কেবল একটি অসাম্প্রদায়িক গ্রন্থ; যে গ্রন্থে অন্য ধর্মের নবীদেরও নবী হিসেবে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার নির্দেশ রয়েছে। এটি এমন একটি গ্রন্থ, যে গ্রন্থে পৃথিবীর বিভিন্ন তথ্য, তত্ত্ব, ইতিহাস, আইনকানুন, বিজ্ঞান, দর্শন, মনস্তত্ত্বের সন্নিবেশ ঘটেছে। এ গ্রন্থে রয়েছে গ্রন্থটি যে অকাট্য ও নির্ভুল তার নিশ্চয়তা। এ গ্রন্থটিই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বহুলপঠিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। গায়ের জোরে কেউ এ গ্রন্থকে আপেক্ষিক বলতে চাইলেও এটি আপেক্ষিক হয়ে যায় না। কাজেই এই গ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর করা প্রশ্নকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেয়া যুক্তিযুক্ত কি না ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।

একটি বিষয় লক্ষ করা গেছে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার ধারণা বা অভিযোগগুলো কেন জানি একপক্ষীয়। এ দেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক ইস্যুর বড় বড় অভিযোগ করা হয়। আর একটি বৃহৎ সম্প্রদায় যে বড় বড় সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে তার খোঁজখবর রাখার কেউ প্রয়োজন মনে করে না। যেমন ধরা যাক চারুকলা অনুষদের ব্যাপারটি। মুসলমান-সংশ্লিষ্ট দু’টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রশ্ন প্রণয়ন করে সাম্প্রদায়িকতার শাস্তি পেলেন দু’জন শিক্ষক। অথচ সেই চারুকলায় মুসলিম ছেলেমেয়েদের দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মূর্তি গড়া ও জীবজন্তুর ছবি আঁকা শেখানো হচ্ছে; যা মুসলমানদের মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। এই সাম্প্রদায়িকতার জবাবদিহি কে করবে, কার কাছে করবে?
এ বছর জানুয়ারি মাসে প্রাথমিক স্কুলের শিশুদের নতুন বই বিতরণ করা হলে সেসব বইয়ে কিছু শব্দকে সাম্প্রদায়িক শব্দ হিসেবে অখ্যায়িত করে আপত্তি তোলা হয়। যেমন- শিশু শ্রেণিতে বর্ণ চেনার কৌশল হিসেবে ‘অ’ তে অজু; ‘ও’ তে ওড়না ইত্যাদি ছাপা হলে আপত্তি ওঠে এসব সাম্প্রদায়িক পঠন-পাঠন যা ছাপা হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো- হিন্দু ছেলেমেয়েরা কেন ‘অ’ তে অজু শিখবে? ‘ও’ তে ওড়না শিখবে? এসব তো মুসলমানদের ধর্মীয় আচার। এসব চলবে না। ‘অ’ তে অজগর, ‘ও’ তে ওল শেখাতে হবে।

অথচ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলা বিভাগে যে পাঠ্যক্রম রয়েছে, তার বেশির ভাগ প্রণিত হয়েছে মুসলিম ছেলেমেয়ের ধর্মীয় মূল্যবোধ পরিপন্থী হিসেবে। যেমন- চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদ, বাউল পদ, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্য, চণ্ডীমঙ্গল কাব্য, অন্নদা মঙ্গল কাব্য, সারদা মঙ্গল, মনসা মঙ্গল, মেঘনাদবধ কাব্য, মেঘদূত ইত্যাদি বৌদ্ধ-হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের ওপর রচিত গ্রন্থ; যা হাজার হাজার মুসলিম ছেলেমেয়েদের যুগের পর যুগ ধরে পড়ানো হচ্ছে। চারুকলা বিভাগে যা শেখানো হয়, সেসবের বেশির ভাগই মুসলিম কৃষ্টির সাথে বৈপরীত্য বহন করে। দুঃখের বিষয়, কেউ-ই এ শিক্ষাগুলোকে সাম্প্রদায়িক শিক্ষা বলছে না। কেন বলা হচ্ছে না সে রাজনীতির খবরও কেউ কেউ হয়তো রাখেন না। এ পৃথিবীতে একমাত্র মুসলমানেরাই অসাম্প্রদায়িক। ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে এ দেশে মুসলামনেরা এসেছিলেন আরবি-ফারসি ভাষাকে সাথে করে নিয়ে। মুসলমানরা তাদের ভাষা আরবিকে ছেড়ে দিয়ে বেদ, রামায়ণ, মহাভারতের সংস্কৃত-বাংলা ভাষাকে সাদরে গ্রহণ করেছে। তারা প্রশ্ন তোলেনি তৎসম শব্দগুলো বেদের, মহাভারতের, রামায়ণের শব্দ; এ ভাষা সাম্প্রদায়িক। কিন্তু বাংলা ভাষার এক লাখ ২৫ হাজার শব্দের মধে মাত্র আড়াই হাজার আরবি-ফারসি শব্দকে মুসলমানি বাংলা বলে একঘরে করে রাখা হয়েছে। এ দেশে ইংরেজরাও এসেছিল আঠারো শতকের মাঝামাঝি। তারা বাংলাকে নিজের ভাষা হিসেবে মানতে পারেনি। তারা ’৪৭-এ দেশ ছেড়েছে, কিন্তু এ দেশের মানুষকে ইংরেজি শিখিয়ে ছেড়েছে। মুসলমানেরা তা করেনি। এখনো এ দেশের মুসলমানেরা ছেলেমেয়ে-বউ-বাচ্চাকে আদর করে লক্ষ্মী বলে সম্বোধন করে থাকেন। এখনো উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ’। তারা কখনোই ভাবেননি এসবের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের অনেক কিছু রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হয় মুসলমানদের মূল্যবোধপরিপন্থী করে।

এ দেশের মুসলমানেরা সব আমলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। সেসব আগ্রাসনের স্বরূপ তেমনভাবে উন্মোচন করা যাচ্ছে না। যাচ্ছে না বলেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষকদের শাস্তি পেতে হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তা। এখানে গণতন্ত্রও আছে, সমাজতন্ত্রও আছে, যা সাংঘর্ষিক। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতাও আছে আবার রাষ্ট্রধর্মও আছে, এটিও সাংঘর্ষিক। যদি রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকে, তাহলে চারুকলার শিক্ষকদ্বয় কিভাবে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারে ভেবে দেখার দরকার রয়েছে।

নয়া দিগন্ত

সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ