রবিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের প্রত্যাশা জাতিসংঘের  » «   এবার উত্তরসহ প্রশ্নফাঁস  » «   জাবিতে ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার ছাত্রদল নেতার অবস্থা আশঙ্কাজনক  » «   যুক্তরাজ্যে দেশজুড়ে পালিত হবে ‘ভিজিট মাই মস্ক’  » «   পুলিশকে গুলি: জড়িতরা যুবলীগ-ছাত্রলীগের  » «   মাধবপুরে হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার  » «   ড্র করে সিলেটের প্রথম ম্যাচ স্মরণীয় করতে চান মাহমুদউল্লাহ  » «   বিএনপি কেন গণস্বাক্ষর-মানববন্ধনের পথে?  » «   সিলেটের কানাইঘাটে গৃহবধূ খুন, আটক ২  » «   ওবায়দুল কাদেরের বিশ্রাম নেওয়ার সময় এসেছে : রিজভী  » «   দিনবদলের মার্কাই হচ্ছে এরশাদের লাঙল: বাবলা  » «   ফের আলোচনায় ‘কাউয়া’  » «   সৌদি জোটের অবরোধ ‘নিষ্ফল’ : কাতারের আমির  » «   নাইজেরিয়ায় আত্মঘাতী হামলায় নিহত ১৮  » «   ‘খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী’  » «  

জমিয়াতের মহাসম্মেলন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’

1517160190_1রেজাউল করিম রাজু : ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগরদের সফেদ ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। আলেম-ওলামাদের ‘ঐতিহাসিক মহামিলন’ টক অব দ্য কান্ট্রি। সারাদেশে শহরবন্দর, হাট বাজার, গ্রামগঞ্জের চায়ের টেবিলে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তেমন প্রচার-প্রচারণা নেই। পোস্টার, লিফলেট, ব্যানার দিয়ে মহাসম্মেলনে যোগ দেবার আহ্বানও ছিল না। দেশে মহাসম্মেলন মানে প্রকাশ্য কিংবা নীরব চাঁদাবাজির মহোৎসব। চলে বাদ্য বাজনা বাজিয়ে সমাবেশে যোগদান। এমন কিছুই ছিল না আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর মাদ্রাসা শিক্ষক পীর-মাশায়েখ মসজিদের ইমাম খতিবদের মহাসম্মেলন ঘিরে। তাছাড়া এমন কিছু ঘটার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ ওরা যে আদর্শ মানুষ গড়েন। নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার ব্রত নিয়ে নীরবে জ্ঞানের আলো বিতরণে বিশাল ভূমিকা পালন করাই তাদের কাজ।
এরা সবাই সমাজের সবচেয়ে সম্মানীত মানুষ। সবশ্রেণীর মানুষ সম্মান করে শ্রদ্ধা করে। হুজুর বা ওস্তাদজ্জি, মাওলানা সাহেব বলে সম্বোধন করে। বিপদে পড়লে পরামর্শ নেয়। দোয়া কামনা করে। এসব মানুষদের শ্রোত চট্টগ্রামের বারো আউলিয়া, রাজশাহীর শাহমখদুম ও শাহনিয়ামত উল্লাহ, খুলনার খানজাহান আলী, দিনাজপুরের চেহেলগাজী, সিলেটের শাহ জালালসহ দেশের ওলি আউলিয়ার স্মৃতি বিজরিত পূণ্যভূমিসহ সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজির হয়েছিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।
ওরা এসেছিলেন নীরবে। আবার ফিরে গেছেন বুক ভরা প্রত্যাশা নিয়ে নিজ। অন্যদের মহাসমাবেশের মত চিৎকার শ্লোগানবাজী ছিল না। বেশীর ভাগই ফজরের নামাজ আদায় করে বাসে চেপে মনে মনে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর নাম জিকির করতে করতে সমাবেশ স্থলে পৌঁছান। তাদের পরনের সফেদ পাঞ্জাবী পাজামা আর মাথায় টুপি জানান দিচ্ছিল আমরা জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের কর্মী। যে সংগঠন ‘আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগরদের’ এক কাতারে এক আঙ্গিনার নিচে ঐক্যবদ্ধ করেছে। তাদের ছোট ছোট নায্য চাওয়া পাওয়া আর স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের কান্ডারী হলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ইসলামী চিন্তাবিদ মরহুম মাওলানা আলহাজ্ব এমএ মান্নান (রহ:) এর সুযোগ্য পুত্র দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক ও জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীন। যার সাথে রয়েছেন সুযোগ্য মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শাব্বীর আহমদ মোমতাজীসহ বেশকিছু পীর-মাশায়েখ। রয়েছেন বিভিন্ন বিভাগ ও জেলার জমিয়াত নেতৃবৃন্দ। মাদরাসা শিক্ষকদের স্মরণকালের বৃহত্তম মহাসম্মেলন প্রমাণ করে দিয়েছেন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন মাদরাসা শিক্ষকদের একমাত্র সংগঠন। মহাসমাবেশের এমন সফলতা নিয়ে উজ্জীবিত সবাই। অনেকে তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন সমাবেশ যে মহাসমুদ্রে পরিণত হবে তা ছিল কল্পনার বাইরে। অবশ্য এমন সফল হবার পেছনে কাজ করেছে সংগঠনের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীনের পরিকল্পনা এবং নেতৃত্বের দৃঢ়তা। তিনি বিভিন্ন বিভাগ ও কয়েকটি জেলায় কয়েকটি সম্মেলন ও মতবিনিময় সভা। তার পরিশ্রম বৃথা যায়নি। ঢাকার মহাসম্মেলনের অতিথিরা অভিভূত হয়েছেন এমন জনসমুদ্র আর শৃঙ্খলা দেখে। ছিল না সামনে বসার জন্য হুড়াহুড়ি তাড়াতাড়ি। ছিল না হাজারো চেয়ারের সারি। যে যেখানে পেরেছেন আল্লাহর জমিনে বসে পড়েছেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বক্তাদের কথা শুনেছেন। নিজেদের মর্যাদা, রুটি রুজির বিষয়ে মন্ত্রীসহ সম্মেলনে অতিথিদের আশ্বাসে আশায় বুক বেঁধেছেন। মাঝেমধ্যে ধ্বনি ছিল ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’। মহাসমাবেশ শেষে ঘরে ফিরে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানান দিয়েছেন মহাসমাবেশের কথা। যদিও এর আগেই মিডিয়ার কল্যাণে সবাই জেনে যায়। যারা যোগ দিয়েছিলেন তাদের মুখে কথার খই ফুটছিল। বর্ণনা দিচ্ছিলেন সমাবেশে যাওয়া থেকে আসা পর্যন্ত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো। তারা ঐতিহাসিক মহাসম্মেলনে যোগ দিতে পেরে যেমন আনন্দিত ছিলেন। তেমনি ইতিহাসের অংশীদারও হয়ে রইলেন। এমন প্রতিক্রিয়ার কথা জানান আমাদের সুযোগ্য ব্যুরো প্রধান এ প্রতিনিধিরা।
রাজশাহী অঞ্চলে জমিয়াতুল মোদার্রেছীনকে যিনি অন্যদের সাথে নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মওলানা অধ্যক্ষ মোকাদ্দাসুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের কান্ডারী মরহুম মাওলানা এম এ মান্নানের সুযোগ্য পুত্র বর্তমান জমিয়তের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দীনের বলিষ্ঠ এবং সাহসী নেতৃত্বে, জমিয়তের সুযোগ্য মহাসচিব শাব্বীর আহমদ মোমতাজীর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কৃপায় এ পর্যন্ত মাদরাসার শিক্ষক-কর্মচারীগণের এবং মাদরাসার অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এ শীতের মধ্যে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া লক্ষ জনতার ঢল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেন মানুষ আর মানুষ। এক মানুষের মহাসমুদ্রে পরিণত হয়। আশা করি মাদরাসা শিক্ষক কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের এ ন্যায্য দাবি প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা অতিসত্বর পূরণ করবেন। জমিয়াতুল মোদার্রেছীন পীর-মাশায়েখগণের আশীর্বাদপুষ্ট একটি সংগঠন। এর প্রতি ওলি-আওলিয়াদের দোয়া আছে। এ যেন ওলামা-মাশায়েখগণের মহাজাগরণী মিলন স্থল।
যশোর ব্যুরো থেকে মিজানুর রহমান তোতা জানান, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওলামা-মাশায়েখের সফল ঐতিহাসিক মহাসম্মেলন যশোর ও খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাদরাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছে। যশোরের জেলা সভাপতি যিনি এই অঞ্চলের প্রধান সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন তিনি তার লম্বাবহর নিয়ে মহাসম্মেলনে যোগ দেন। তিনি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমার জীবনে এতবড় সম্মেলন দেখিনি। সম্মেলনে যোগ দেয়া মাদরাসা শিক্ষক মো: মোশাররফ হোসেন বলেন, এই সম্মেলনে এতো লোক হবে ভাবিনি। এটি জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের পতাকাতলে দেশের ওলামা-মাশায়েখদের মহামিলন। জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী সূত্রে জানা গেছে, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মাগুরা, নড়াইল, বাগেরহাট জেলা সদর ছাড়াও স্ব স্ব উপজেলার হাজার হাজার মাদরাসা শিক্ষক ও কর্মচারীরা ঢাকার মহাসম্মেলনে যোগ দেন। এলাকা থেকে বাস ভর্তি করে তারা ঢাকায় যান। সম্মেলন শেষে তারা এলাকায় ফিরে এসেছেন। মাদরাসা শিক্ষক ও কর্মচারী শুধু নয়, মহাসম্মেল ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বরিশাল ব্যুরো থেকে নাছিম উল আলম জানান, ২৭ জানুয়ারির মহাসম্মেলনে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ছাড়াও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে যথেষ্ঠ বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। দেশের কোনো অরাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বিশাল পরিসরে এতবড় সমাবেশ সকলকেই ‘তাক’ লাগিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতাশীন দলের মতবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের একাধিক নেতাকর্মী গতকাল মাদরাসা শিক্ষকদের এতবড় সমাবেশ ‘এযাবতকালের নজিরবিহীন’ বলেও মন্তব্য করেন। ‘মাদরাসা শিক্ষকগণ কোন রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি না করেই প্রকৃত মানুষ গড়ার কারিগরের ভূমিকা পালন করছে’ বলেও মন্তব্য করেছেন একাধিক পেশার মানুষ। নোয়াখালী ব্যুরো থেকে আনোয়ারুল হক জানান, এদেশের মাদরাসা শিক্ষক কর্মচারীদের একক বৃহৎ অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের উদ্যোগে স্মরণকালের বৃহৎ ওলামা-মাশায়েখ সম্মেলন নোয়াখালীতে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। মহাসমাবেশ ঘুরে এসে রাজধানী ঢাকা থেকে ইনকিলাবের কয়েকজন শুভাকাক্সক্ষী এ প্রতিবেদককে জানায়, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে লোক সমাগমে অনেকটা ব্যর্থ- সেক্ষেত্রে নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে মহা সমাবেশ সক্রিয় অংশগ্রহণ এদেশের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ নিয়ে নোয়াখালীতে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। এদেশের মাদরাসা শিক্ষক কর্মচারীদের অরাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে স্মরণকালের বিশাল ওলামা-মাশায়েখ মহাসমাবেশ তারই প্রতিফলন।
বগুড়া ব্যুরো থেকে মহসিন রাজু জানান, জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সমাবেশের পর বগুড়ার মাদরাসা অঙ্গনের শিক্ষক কর্মকর্তা, কর্মচারীদের মধ্যে রীতিমত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, সবার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ। মহাসমাবেশ থেকে ফিরে জমিয়াতুল মোদার্রেছীন বগুড়া শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হাই বারী ইনকিলাবকে বলেন, একটি মহল এই সমাবেশ নিয়ে মাদরাসা শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছড়াবার চেষ্টা করলেও সমাবেশের সার্বিক সফলতায় ওই মহলটির মুখে চুনকালি পড়েছে, আবারো নতুন করে সবার চোখে তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। বগুড়ার জমিয়াত নেতা ছাড়াও অনেক সাধারণ শিক্ষক তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, রাজধানীর বুকে গত কয়েক দশকে এতবড় ও সু-শৃঙ্খল সমাবেশ তারা দেখেননি। এই বিশাল সমাবেশ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, জমিয়াতুল মোদার্রেছীন শুধু কাগজে কলমেই নয় বাস্তবেই বৃহত্তম অরাজনৈতিক সংগঠন। কক্সবাজার ব্যুরো থেকে শামসুল হক শারেক জানান, কারো মতে সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশ ঐতিহাসিক, কারো মতে এটি স্মরণকালের আলেম ওলামাদের ঐতিহাসিক বিশাল সমাবেশ। কারো মতে, দেশের আলেম-ওলামাদের এই সমাবেশে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। কক্সবাজার তৈয়বিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা শাহাদাত হোসাইন বলেন, এই সমাবেশ ঐতিহাসিক। এই সমাবেশে যোগ দিতে পেরে তিনি ধন্য। তিনি এজন্য জমিয়াত নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।
কক্সবাজার হাশেমিয়া কামিল মাদরাসার আরবী প্রভাষক মাওলানা সলিমুল্লাহ জানান, এই সমাবেশ দেখে তিনি অবিভূত। তিনি আশা করেন মাদরাসা শিক্ষকদের সব সমস্যা অচিরেই সরকার সমাধান করে দেবেন। টেকনাফের জমিরিয়া মাদরসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ফরিদুল আলম বলেন, টেকনাফ থেকে আমরা যেভাবে দলে দলে ঢাকার এই সমাবেশে যোগ দিয়েছি, একইভাবে তেঁতুলিয়ার শিক্ষকরাও যোগ দিয়েছেনে। বলতে পারি এই মহাসম্মেলনের ঢেউ লেগেছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত। দিনাজপুর অফিস থেকে মাহফুজুল হক আনার জানান, ঐতিহাসিক একটি নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। মাদ্রাসা শিক্ষকদের একমাত্র ও অরাজনৈতিক সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসম্মেলন ইতিহাসই রচনা করেছে। সম্মেলনের কথা ছড়িয়ে পড়েছে শহর থেকে গ্রামে। গ্রামাঞ্চলের মুরুব্বী ঘর হিসাবে পরিচিত মাদরাসাগুলোতে এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মহাসম্মেলনের কথা।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের গ্রহণযোগ্যতায় বিগত দিনে একটি পক্ষ মাদরাসা শিক্ষকদের বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে জমিয়াতুল মোদার্রেছীনকে কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা করেছিল। কিন্তু সংগঠনের বর্তমান সভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনের দৃঢ় নেতৃত্ব সংগঠনকে এগিয়ে নিয়েছে। সাহস যুগিয়ে শক্ত হাতে পরিচালনা করেছে জমিয়তের মহাসচিব শাব্বীর আহমদ মোমতাজী। হাজারো প্রতিকূলতাকে জয় করে মাদরাসা শিক্ষকদের কল্যাণে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে এসেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসম্মেলনে স্মরণকালের জনসমাগমের মাধ্যমে সেই বিচলিত অবস্থার অবসান হয়েছে। দেশবরেণ্য ওলেমা-মাশায়েখদের উপস্থিতি আর দ্বীনি শিক্ষার হাজার হাজার মাদরাসা শিক্ষকের সাথে সাধারণ মানুষের ঢল দেখেছে সুদূর তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফের মানুষ। প্রয়োজনের কারণেই দাবি উঠে। আর দাবি আদায়ে রাজপথ নয়- নয় সহিংসতা প্রয়োজন ধৈর্য আর গ্রহণযোগ্যতা। সম্মেলনে উপস্থিত দাবি পূরণে সরকারের সহায়ক ভূমিকায় থাকা মন্ত্রী ও নীতি নির্ধারকদের বক্তব্যেই। এখন শুধু দরকার প্রধানমন্ত্রীর শুভদৃষ্টি। আর এটা বেশী দূরে নয়। কারণ ধর্মভীরু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বীনি শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে জঙ্গি এবং দুর্র্নীতিমুক্ত করার লক্ষে ইতোমধ্যেই তার প্রমাণ রেখেছেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘অবাক কান্ড’

1517160020_18

স্টালিন সরকার : মাদরাসা শিক্ষকদের সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসম্মেলন-২০১৮ অবাক কান্ড মনে করছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের লোকজন। যারা আশপাশের অফিসে-দোকানে কাজ করেন, পায়ে হেঁটে ওই পথে নিয়মিত চলাচল করেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকাররা জনসমাগম দেখে হয়ে গেছেন হতবাক। তাদের ভাষায় হুজুরদের অনুষ্ঠানে এমন দশা হবে বুঝতে পারলে এক দিনেই কয়েক হাজার টাকা রোজগার করা যেত। ফুটপাতের চায়ের দোকানদার, ফেরি করে চা-বাদাম-পানি বিক্রেতা, টিএসসির পিঠা বিক্রেতা সবার আফসোস, আগে যদি জানতাম! এমনকি টিভি মিডিয়াগুলোর নীতি নির্ধারকরাও বুঝতে পারেননি ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন সাহেবের সমাবেশে এতো লোকের গ্যাদারিং হবে। সমাবেশে চলার সময় খবরে দু’তিনটি টিভি চ্যানেল ‘লাইভ অনুষ্ঠান’ দেখালেও অন্যান্যরা দেখাতে পারেননি। সমাবেশে ব্যাপকতা দেখে ‘শিক্ষামন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতা’ সরাসরি প্রচারের ইচ্ছা থাকলেও ‘প্রস্তুতি’ না থাকায় টিভি সাংবাদিকদের আফসোস করতে দেখা গেছে।
২৭ জানুয়ারি লাখো আলেম-ওলামা-পীর-মাশায়েখের জমায়েতের সময় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চিরচেনা বাদাম বিক্রেতা, ফুচকা বিক্রেতা, চকলেট-লজেঞ্জ বিক্রেতা চোখে পড়েনি। ফুল বিক্রেতা পথশিশুদেরও দেখা যায়নি। দু’চারজন হকারকে দেখা যায় পানি বিক্রি করতে। অথচ কোনো সভা সমাবেশের খবর পেলে উদ্যানের আশপাশের হকাররা লোকসমাগমের আন্দাজ করে বিক্রি বাট্টা করার আগাম প্রস্তুতি নেন। কিন্তু জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সম্মেলনের ‘এতো লোক হবে’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হকারদের কেউ আন্দাজ করতে পারেননি। সমাবেশের সময় উদ্যানের পাশের বাংলা একাডেমী-টিএসসি, হাইকোর্ট মাজার, ইঞ্জিনিয়ারর্স ইনস্টিটিউট-শিশুপার্ক ও সড়ক ভবনের সামনের ফুটপাতে চা বিক্রেতাদের দোকানের সামনে দেখা যায় অসংখ্য মিনারেল ওয়াটারের বোতল। নিত্যদিন তারা যে এক টাকা গøাস দরে জারের পানি বিক্রি করেন সেগুলো পিছনে লুকিয়ে রেখেছেন। কোনো কোনো চা-রুটি-ফুচকার দোকানদার জারের পানি যাতে ক্রেতারা চাইতে না পারেন সে জন্য পানির জার দোকানের আশপাশে রাখেননি। রহস্য কি? প্রশ্ন করতেই একজন চা বিক্রেতা জানালেন, ফজরের সময় উদ্যানের চতুর্দিকে যখন শত শত বাস ভিড়তে শুরু করে; সাদা পাঞ্জাবী ও টুপি মাথায় হাজার হাজার হুজুর (মাদরাসার শিক্ষক) নামতে শুরু করেন; তখন বুঝতে পারেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির সমাবেশ না হলেও এটা কোনো সাধারণ সমাবেশ নয়। ততক্ষণে বোতলজাত পানি বিক্রি করা বিভিন্ন কোম্পানীর লোকজন এসে দোকানদারদের পানির জার সরিয়ে বোতলজাত পানি বিক্রির পরামর্শ দেয়। কোম্পানীগুলো লোকজন ছোট্ট ছোট্ট পিক-আপ এ করে পানির বোতল নামিয়ে দিয়ে যায়, বিক্রির পর টাকা নেয়ার শর্তে। অত:পর শুরু হয় বোতলের পানি বিক্রি। ফুটপাতের অনেক চা বিক্রেতা অধিক লাভ এবং অল্প সময়ে অধিক বিক্রির উদ্দেশ্যে দুধ চা বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে শুধু রং চা বিক্রি করেন।
টিএসসি এবং ইঞ্জিনিয়ারর্স ইনস্টিটিউটের গেইটের সামনে চা-পাউরুটি-বিস্কেট বিক্রি করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে জানান, তারা বুঝতেই পারেননি এমন লোক সমাগম হবে। জহির নামের এক চা বিক্রেতা বললেন, ‘স্যার উদ্যানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমাবেশ হলে প্রচুর লোকজন আসে আমাদেরও ব্যবসা হয়। তখন আমরা অধিক বেচাবিক্রির জন্য আগাম প্রস্তুতি নিয়ে থাকি। কিন্তু অন্যান্য সভা-সমাবেশে হাকডাক হলেও লোকজন তেমন হয় না। বিশেষ করে বিভিন্ন সংগঠন মন্ত্রীদের প্রধান অতিথি করে যেসব সভা করেন সেগুলোতে ৫শ’ থেকে ৫ হাজার লোকের গ্যাদারিং হয়। এমনও দেখা যায় কিছু সংগঠন আছে তাদের সমাবেশে দু’শ লোকও নেই; অথচ বিশল মঞ্চ এবং ৩০ থেকে ৪০টি মাইক টানানো হয়েছে, প্রধান অতিথি কোনো না কোনো মন্ত্রী। এই সভাতে (২৭ জানুয়ারি) দু’জন মন্ত্রী আসবে জেনেও লোকজন তেমন হবে না মনে করেছি। কিন্তু লাখ লাখ লোক দেখে আমরা অবাক! আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মহাসমাবেশে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এখানে (মাদরাসা শিক্ষকদের সমাবেশ) সেটাও নেই। আগে যদি বুঝতাম তাহলে দুই তিন মাসের ব্যবসা একদিনেই করে নিতাম। বয়োবৃদ্ধ এক হকার বললেন, ‘স্যার মিটিং দেখে আমরা অবাকই হয়েছি। আওয়ামী লীগ বিএনপির মিটিং হলে মিছিল হয়। চিৎকার চেচামেচি হয়। মারামারি এবং চরম বিশৃঙ্খলা হয়। কিন্তু হুজুরদের সমাবেশে (আলেম-ওলামা) সে ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা চোখে পড়েনি। এত্তো এত্তো লোক; কোনো কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সবাই ছোট্ট ছোট্ট গেইট দিয়ে প্রবেশ করছেন। কম বয়সের হুজুররা বয়োবৃদ্ধ হুজুরদের আগে প্রবেশের জায়গা করে দিচ্ছেন। উদ্যান থেকে বাইরে বের হতে চাইলে কয়েকশ’ গজ দূরে শিশুপার্কের গেইট দিয়ে বের হচ্ছেন। কোনো হুড়োহুড়ি নেই। এ ধরনের দৃশ্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোনো বড় সমাবেশে চোখে পড়ে না’। অবশ্য মিটিং চলার সময়ও দেখা গেছে উপস্থিত জনতা সুশৃঙ্খলভাবে মঞ্চের সামনে বসে পড়েছেন। একে অন্যকে বসতে সহায়তা করছেন। যারা সমাবেশের মাঝেখানের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তারাও মাইকে বলার পর সেখানেই বসে পড়েন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আশপাশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-ফেরিওয়ালা-হকারদের কথা শুনে মনে হলো ২৭ জানুয়ারি জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের লাখ লাখ লোকের উপস্থিতির মহাসম্মেলনে বেচা-বিক্রি করতে না পারায় আফসোস থেকেই যাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ