বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ |
সর্বশেষ সংবাদ
শেখ হাসিনার ‘ফটোজেনিক মেধাবী’ জিনিসটি আসলে কী?  » «   সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে হবে : শিবির সভাপতি  » «   খালেদার বক্তব্য বিকৃত করে রায় দিয়েছেন আখতারুজ্জামান!  » «   একজন ভাষাসৈনিক গোলাম আজম এবং আমার ভাবনা  » «   আগামী বছর নতুন পদ্ধতিতে এসএসসি  » «   ধনীদের আরো বেশি কর দেয়া উচিত: বিল গেটস  » «   খালেদা ভোটের যোগ্যতা হারালে কিছু করার নেই: কাদের  » «   তারেকের স্ত্রী, কন্যার ব্রিটিশ নাগরিকত্বের আবেদনের খবর  » «   খালেদার জামিন আবেদনের আগেই কপি চান অ্যাটর্নি জেনারেল  » «   ব্যাংকে জালিয়াতির কোনো ঘটনায় ছাড় দেয়া হয়নি: তোফায়েল  » «   বাংলাদেশকে কেউ আর অবহেলার সাহস পায় না: প্রধানমন্ত্রী  » «   বাসের ধাক্কায় ৪ অটোযাত্রী নিহত  » «   ২১ গুণীজনকে একুশে পদক দিলেন প্রধানমন্ত্রী  » «   ভারতের দুর্ভাগ্য যে বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় আছে: মমতা  » «   খালেদা জিয়ার আপিল গ্রহণের শুনানি বৃহস্পতিবার  » «  

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের অবদান

26_1মঈনুল আলম:  যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে মুসলিমদের কাছে কত ঋণী, সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কোনো ধারণা আছে কি? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানেন কি, ১৮৮৫ সালের আগে তার পিতামহ ফ্রেডেরিক ট্রাম্প যখন পূর্ব জার্মানির এক অখ্যাত শহরে যেকোনো কাজ করে পেট চালাতেন, তার চার দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিভাগ আমন্ত্রণ করে প্রথম মুসলিম দলকে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন দেয়ার জন্য, তাদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ সমাধা করার জন্য। সে সময় সেই মুসলিম দলটি যদি কাজটি সমাধা করে না দিত, আজকের যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম-দক্ষিণ সীমান্তরেখা হয়তো অন্য রকম হতো, মেক্সিকোর বিরুদ্ধে দেয়াল নির্মাণ করার ভূমিরেখাও ট্রাম্প খুঁজে পেতেন না।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের আগমন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবেন। এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি গোপন তালিকাভুক্ত ডজনখানেক আরব ও মুসলিম জনসংখ্যাপ্রধান দেশ থেকে মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে আগমন নিষিদ্ধ করে রেখেছেন।

ট্রাম্পের পিতামহ ফ্রেডেরিক ১৮৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনের চার দশক আগে ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রথম মুসলিম দলকে আমন্ত্রণ করে এনে আমেরিকায় অভিবাসন দিয়েছিলেন। ১৮৪৮ সালে মেক্সিকোর সাথে আমেরিকার যুদ্ধ সমাপ্ত হলে আমেরিকা তার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিরাট ভূ-এলাকার অধিকারী হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেটের সরকারি ইতিহাসবিদ মার্শাল ট্রিম্বল বলেন, ‘এই বিরাট ভূ-এলাকা অত্যন্ত শুষ্ক ছিল, সেখানে খুবই স্বল্পসংখ্যক জলের উৎস পাওয়া যেত। এই ভূ-এলাকাটির মানচিত্র তৈরি করা এবং এর মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করার জন্য ভ্রমণে আমেরিকানদের এমন এক প্রাণীর প্রয়োজন হলো, যে প্রাণী ৬০০ থেকে ৮০০ পাউন্ড ওজনের ভার বহন করতে পারে এবং একই সময়ে পানি পান না করে অনেক অনেক দূর অতিক্রম করতে পারে।’ তারা দেখতে পেল উটই হচ্ছে এ প্রয়োজন মেটানোর জন্য আদর্শ প্রাণী। কিন্তু শুধু উট হলে তো হবে না, উট চালাতে পারে- এমন মানুষও তো লাগবে।

মার্কিন সরকারের সে সময়ের সমরমন্ত্রী জেফারসন ডেভিস আমেরিকার উটবাহিনী (ইউএস ক্যামেল কোর) গড়ে তোলার জন্য কংগ্রেস থেকে ৩০ হাজার ডলার ব্যয় মঞ্জুর করালেন। যুক্তরাষ্ট্রের সমর বিভাগ কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশ থেকে উট ও উটচালকদের আসার আমন্ত্রণ জানালেন। প্রথম যে মুসলিম দলটি এলো, তাদের মধ্যে হাজী আলী প্রধান হয়ে উঠলেন। তুরস্কের এক বন্দর থেকে হাজী আলী জাহাজে আরোহণ করেন। তিনি ২৫ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, অতঃপর মক্কায় হজ পালন করেন। হাজী আলী আমেরিকায় আগমন করলেন। কিন্তু আমেরিকানদের মুখে ‘হাজী আলী’ নামটি উচ্চারণ করা কঠিন হলো। তারা তাকে ‘হাই জলি’ (Hi Jolly) নামে ডাকতে শুরু করল। সেটাই তার আমেরিকায় সরকারি নাম হয়ে গেল।

হাজী আলী ও তার সঙ্গী মুসলমানেরা তাদের সাথে আমদানি করা উটের বহর নিয়ে মার্কিন সেনাসদস্যদের সাথে নিউ মেক্সিকো স্টেট থেকে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট পর্যন্ত প্রায় মরুভূমিসদৃশ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণের নীলনকশা প্রণয়ন করে। মুসলিমদের এই অভিযাত্রীদল দীর্ঘ ভ্রমণ পথ জরিপ করে আমেরিকানদের ঘোড়ায় টানা ‘ওয়াগন’ চালানোর জন্য একটি দীর্ঘ পথের নকশা প্রণয়ন করে। পরবর্তীকালে এই নকশার ভিত্তিতে তৈরি করা সড়কের ওপর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট-৬৬ নামের হাইওয়েটি নির্মিত হয়েছে। অ্যারিজোনা স্টেটের সরকারি ইতিহাসবিদ মার্শাল ট্রিম্বল বলেন, উটের পিটে চড়ে মুসলিমদের এই জরিপ অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছিল।

উট আরোহী মুসলিম অভিযাত্রীদলের সাথে থাকা মার্কিন সেনা সদস্যদের নেতা শ্বেতাঙ্গ আর্মি লেফটেন্যান্ট মুসলিম দলটির কার্যকলাপে খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ অধিবাসী ও অশ্বারোহী ‘কাউ বয়’ শ্বেতাঙ্গরা উটগুলোকে অত্যন্ত বিচিত্র প্রাণী রূপে দেখতে লাগল এবং উটের ওপর সওয়ার হওয়া মুসলিমদের প্রতি দারুণ অপছন্দ প্রকাশ করতে লাগল। ফলে মার্কিন কংগ্রেস অভিযানটি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং এর অর্থমঞ্জুরি বন্ধ করে দেয়। ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই কার্যক্রমটি বন্ধ হয়ে যায়। উটগুলোর কিছু নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়, কিছু চিড়িয়াখানায় যায়, কিছু উট মরুভূমিতে পালিয়ে যায়, কিছু উট শ্বেতাঙ্গ সেনা লেফটেন্যান্ট নিয়ে যায় এবং অবশিষ্ট উটগুলো হাজী আলী তার সাথে নিয়ে গিয়ে অ্যারিজোনায় বসবাস স্থাপন করেন।
হাজী আলী সময় সময় মার্কিন সেনাদের পথপ্রদর্শক রূপে কাজ করতে থাকেন, কিছুকাল স্বর্ণখনিতে মাল পরিবহনের কাজ করেন, কিছুকাল ডাক বিভাগে মেইল আনা-নেয়ার কাজ করেন। সেনাসদস্যদের কোনো উট হারিয়ে গেলে তা অনুসন্ধানের জন্য হাজী আলীর ডাক পড়ত। হাজী আলী মেক্সিকোর এক মহিলাকে বিয়ে করেন, কয়েকটি কন্যাসন্তানের বাবা হন।

১৯০২ সালে সত্তরোর্ধ্ব বয়সে হাজী আলী ইন্তেকাল করেন। মার্কিন ইতিহাসবিদ গ্যারি নাভান বলেন, হাজী আলী নিদারুণ অর্থাভাবের মধ্যে মারা যান। তিনি মার্কিন সরকার থেকে পেনশন পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। কয়েকজন মার্কিন জেনারেল তার জন্য সুপারিশ করলেও তাকে পেনশন দেয়া হয়নি।
হাজী আলী এবং তার সঙ্গী মুসলিমদের গ্রুপ উটের বহর নিয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমে মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত নির্ধারণ করে সড়করেখা নির্মাণ করে না দিত, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মেক্সিকোর সীমান্তরেখা অস্পষ্টই থেকে যেত। তখন মেক্সিকোর সাথে সীমান্তে ট্রাম্পের দেয়াল নির্মাণ করার হুমকি বাস্তবায়নের জন্য সঠিক জমি কোথায় পেতেন ট্রাম্প?

১৯৩৪ সালে অ্যারিজোনা স্টেটের ‘কোয়ার্টজসাইন’ শহর কর্তৃপক্ষ ‘অগ্রপথিকের কবরস্থানে’ (Pioneer Graveyard) আলীর নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করে। স্মৃতিস্তম্ভে একটি পিরামিড ও এর শীর্ষে একটি উট স্থাপন করা হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভে লিখিত হয়েছে- ‘হাই জলির অন্তিম আশ্রয়স্থল’। খোদাই করে লিখিত হয়েছে-
‘হাই জলির শেষ নিবাস
হাই জলি
সিরিয়ার কোনো স্থানে জন্মগ্রহণ করেন
এই দেশে আগমন করেন
১০ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৪
উটচালক, প্যাকার, স্কাউট
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি বিশ্বস্ততার সাথে
৩০ বছরের অধিক কাল সেবা দেন
অ্যারিজোনা হাইওয়ে ডিপার্টমেন্ট।’
ট্রাম্প, আপনি যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমান আগমন বন্ধ করতে পারেন বটে, হয়তো কিছু দিনের জন্য; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস থেকে মুসলিমদের অবদান মুছে ফেলতে পারবেন?

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, কানাডাবাসী

সংবাদটি শেয়ার করুন:

সর্বশেষ সংবাদ